khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

একাত্তরের বিজয় আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন

55

ডা. এস এ মালেক : ১৯৭১’র ১৬ ডিসেম্বর জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। ২৩ বছর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার মহান বিজয় অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তান নামক দখলকৃত অঞ্চল স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। জাতি অর্জন করে অনন্যসাধারণ লাল-সবুজ স্বাধীনতার পতাকা। যা পত পত করে উড়তে শুরু করে স্বাধীন বাংলার আকাশে। মনোমুগ্ধকর জাতীয় সঙ্গীত শুরু হয় বাঙালির কণ্ঠে। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বাঙালি বাংলাকে ভালোবাসে বলেই, চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ স্বাধীনতার অর্জনে আত্মবিসর্জন দিতে হয়েছে ৩০ লাখ বাঙালি সন্তানকে। ইজ্জত হারিয়েছেন লাখ লাখ বাঙালি মা-বোনেরা। পোড়া মাটির নীতি অনুসরণের কারণে ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয়েছে সবুজ সম্পদশালী বাংলাদেশ। ১৯৭১-এর ৯ মাস বাংলার আকাশ ছিল বারুদের গন্ধে ভরপুর। ২৫ মার্চের কাল রাতে যে ভয়াবহ নর হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, ৯ মাস তা চলেছে বিরতিহীনভাবে। এক দিকে নীরব, নিরীহ, নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালি, অপরদিকে বিশ্বের শক্তিশালী সমর সজ্জায় সজ্জিত বর্বর হানাদার বাহিনী বাদ দেয়নি কাউকে। মায়ের কোলের শিশু থেকে শুরু করে আক্রান্ত বিছানায় পড়া বৃদ্ধকে, মস্তিষ্ক বিকৃত পাগল যুদ্ধের অনুভূতি কি তারা জানত না।

রাজবাড়ীর সেই নারায়ণকেও শহরে ঢোকা মাত্রই হানাদার বাহিনী গুলি করেছে। কী নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ড! একটা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। পুরুষদের বাড়ি থেকে বের করে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করেছে আর মহিলাদের একের পর এক ধর্ষণ করেছে। মেয়ের সামনে মাকে, মায়ের সামনে মেয়েকে, পুত্রবধূ, এমন কি (৫০-৬০) বছরের বৃদ্ধ মহিলারাও রক্ষা পায়নি দস্যুদের কবল থেকে। গ্রামবাংলার একেক এলাকায় একেক দিন বিহারিদের সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছেন। বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়েছে, গুলি করা হয়েছে। শস্যক্ষেত্র ফসফরাস ছিটিয়ে অগ্নিদগ্ধ করা হয়েছে। দিনের শেষে ৫-৭ গ্রামে অপারেশন চালিয়ে বিশেষ করে হাটবাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাটের গুদাম সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। বর্বর পাকিস্তানি দস্যুরা ধর্ষণকে যুদ্ধের এক অমর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ওদের দৃষ্টি ছিল সংখ্যালঘু নারীদের ওপর। দিনের পর দিন ওদের মিনি ক্যান্টনমেন্টে রেখে অথবা পাকা বাঙ্কারে যুবতি নারীদের আটকে রেখে হত্যা করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৩ দিন পরে ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস যখন দখল করা হয়, তখন সেখানকার বাঙ্কারে বেশ কিছু যুবতী নারীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে যেখানে রেলওয়ে কলোনি থাকায় বিহারি ঘাঁটি ছিল, সেখানে ৯ মাসে প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। বিহারিরা ও বাঙালি রাজাকার, আলবদর, আলশামস, জামায়াত-ছাত্র শিবির এই দখলদার বাহিনীকে সাহায্য করেছে। অবলা নারীদের গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে হানাদার বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেছে। এত রক্ত পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্রে স্বাধীনতার জন্য দিতে হয়েছে বলে মনে হয় না। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছিল বরকত-সালামরা। ১৯৬৬ তে শ্রমিক, কৃষক, ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ২ দিন আগে আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে নিয়ে বধ্যভূমিতে হত্যা করেছে। এই বধ্যভূমি শুধু রায়েরবাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রত্যেকটা জেলা, মহল্লা, যেখানে সেনাবাহিনী ঘাঁটি করেছিল, সেখানেই বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। কয়টা গণকবরের সন্ধান আমরা পেয়েছি; শত শত কবর এখনো অজানা রয়েছে। যারা স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেয়নি বা যারা ওই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, হানাদার বাহিনীর সহযোগিতা করেছে, তারা শুধু একটা অপচেষ্টাই চালিয়ে আসছে যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তা গোপন রাখা। মনে পড়ে রাজবাড়ীর খুশির কথা, যশোরের মশিউর রহমানের কথা, যাদের বেওনেট চার্জ করে দড়িতে জিপের সঙ্গে বেঁধে দ্রুত রাজপথের ওপর দিয়ে টেনেহিঁচড়ে হত্যা করা হয়েছে। বাংলার এমন কোনো পল্লী নেই, এমন কোনো বাড়ি নেই, যার কেউ না কেউ মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যেসব মুক্তিযোদ্ধা সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন, জয়বাংলা ধ্বনিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু আত্মসমর্পণ করেননি- সেই অগণিত বাংলার শহীদ সন্তানদের জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

১৬ ডিসেম্বর অবশ্যই আমাদের বিজয় দিবস। কিন্তু বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর আমরা যা হারিয়েছি, সে ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। ডা. রাব্বির মতো চিকিৎসক, ডা. আলীমের মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞ, মুনির চৌধুরীর মতো বুদ্ধিজীবী, জেসি দেবের মতো দার্শনিকসহ কত গুণীজনকে যে আমরা হারিয়েছি, তার হিসাব নেই। প্রত্যেক জেলা-মহকুমায় অবস্থিত, মিনি ক্যান্টনমেন্টে যেখানে বেছে বেছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের ডেকে এনে হত্যা করেছে। আর তাদের সহযোগী ছিল এ দেশের কুলাঙ্গার, স্বাধীনতার শত্রু জামায়াত-শিবির, আলবদর, আলশামস। বাংলার মাটির এ কুসন্তানরা যদি হানাদার বাহিনীকে পথ না দেখাত, তা হলে ৩০ লাখ লোককে জীবন দিতে হতো না। বাংলার মাটিতে এখনো বিহারি বলতে যা বুঝাতে হয়, কয়েক লাখ লোককে আহার জোগায়, বসবাস করার অধিকার দেয়, ওরা যে অপরাধ করেছিল তাতে বাংলার মাটিতে তাদের বসবাস করার অধিকার নেই। ৭ মার্চের ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বাঙালি জাতির জনক আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে যুদ্ধে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘বাঙালি যখন রক্ত দিয়েছে, তখন রক্ত আরো দিবে। তবুও দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।’ তিনি ঘরে ঘরে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘বাঙালি যখন মরতে শিখেছে, অর্থাৎ চরম আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছে, তখন কেউ তাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ ১৯৭০-এর নির্বাচনে একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছিলেন। হয়তো একটু আপস করলে, তিনিই প্রধানমন্ত্রী হতেন। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, বাংলার মানুষের অধিকার আদায় করাই তার একমাত্র লক্ষ্য। চরম মূল্য দিয়েই যে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, তা বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছেন।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলায়, মাত্র সাড়ে ৩ বছর বঙ্গবন্ধু দেশ শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ওই সাড়ে ৩ বছরে দেশকে তিনি যে অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বের এক বিস্ময়কর ঘটনা। বঙ্গবন্ধু নেই প্রতিবিপ্লবের পর প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশ রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল, তা থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশকে পুনরুদ্ধার করেছেন। আজ স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায়। রাজাকার, আলবদর, আলশামস, স্বাধীনতার শত্রু ও তাদের সহযোগীরা ক্রমাগত কিছু ঘটাচ্ছে। কিন্তু মুজিবের বাংলায় ওদের ঠাঁই নেই। শেখ হাসিনার বাংলায় ওদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। এ বাংলা মুক্তিযোদ্ধাদের, বাংলার স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।

রক্তে রঞ্জিত আমাদের বিজয়গাথা। শোককে শক্তিতে পরিণত করে আমরা আমাদের স্বাধীনতাকে সুসংহত করে চলেছি। তাই স্বাধীনতার সপক্ষের সব শক্তিই পারে আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে। বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার শুধু স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিরই আছে। স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে আপস করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা সম্ভব নয়। যে মহান বিজয় আমরা অর্জন করেছি, সে বিজয় আমাদের সংরক্ষণ করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বাঙালিকে স্বাধীন করেছেন। সেই একই স্লোগান দিয়ে আমরা স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করব। বাঙালি আজ এক বিজয়ী জাতি। পরাজয়ের গ্লানি কখনো আর স্পর্শ করবে না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শত-সহস্র বছরের সাধনার সুফল আমরা বিনষ্ট হতে দিতে পারি না। আজ বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তার সুযোগ্য কন্যা তার স্থানে বাংলাদেশের হাল ধরেছেন। মাত্র দেড় দশকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছেন, তা আজ প্রতিটি বাঙালির কাছে অনুভূতির বিষয়, গৌরবের বিষয়, আত্মোপলব্ধির বিষয়। বিজয়ী বাঙালিকে আর কেউ পরাজিত করতে পারবে না। যেভাবে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তা আর ক’টা বছর সময় পেলে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, যেখান থেকে বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। আমরা বিজয় অর্জন করেছি। বিজয়ের বেশেই আমরা অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখব।

জয়বাংলার অর্থ হচ্ছে- ‘বাংলার প্রতিটি মানুষের বিজয়, বাংলাদেশের বিজয়, বাঙালি জাতির বিজয়; আর এ বিজয় চিরঞ্জীব।’

ডা. এস এ মালেক : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.