khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাংলা বৌদ্ধ ত্রিপিটক বাংলাদেশে প্রকাশিত হল

35

সোনা কান্তি বড়ুয়া  : ডিসকভারি অব বাংলাদেশে  ‘বাংলা সাহিত্যে সংযুক্ত হলো বৌদ্ধদের সমগ্র ত্রিপিটক’!   হাজার বছর পরে বাংলাদেশের  বিজয় মাসে শুক্রবার ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭  বিকেলে   সর্ব প্রথম বাংলা ভাষায় আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ত্রিপিটক প্রকাশিত হলো,  চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও সার্বজনীন শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহারে !  গৌতমবুদ্ধের বঙ্গলিপি অধ্যয়ণ সহ বাংলা বর্ণমালার হাতধরেই বাঙালি জাতির সভ্যতার যাত্রায় বাংলাভাষা পালিভাষার বিবর্তিত রূপ পরিগ্রহ করে প্রথম বাংলা বইয়ের নাম “চর্যাপদ” !  বৌদ্ধ ধর্মের মুল গ্রন্থ ত্রিপিটক হচ্ছে তিনটি পিটক, যথা : ( ক). সূত্র পিটক (খ.) বিনয় পিটক (গ.) অভিধর্ম পিটক , ষষ্ঠ সংগীতির শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে পূর্ণাঙ্গ ত্রিপিটকের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ভারতবর্ষে ধর্মান্ধ হিন্দু   রাজা শশাংকের (৭ম শতাব্দী) বৌদ্ধ হত্যাযজ্ঞ সহ ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্র, বুদ্ধগয়ার মহাবোধি বৃক্ষ এবং পবিত্র  বৌদ্ধ ত্রিপিটক ধংস করার পর  বিগত  হাজার বছর পর্যন্ত বৌদ্ধ সমাজ এবং ত্রিপিটক দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতিতে কোন অস্তিত্ব ছিল না। “বাঙালি এনলাইটেনমেন্ট যুগে জনৈক জনপ্রিয় কবির ভাষায়, “বিশ্বমানব হবি যদি শাশ্বত বাঙালি হও, সম্পূর্ণ বাঙালি হও।“ বুদ্ধের জীবনী নিয়ে আমাদের বাংলা সাহিত্যের যশস্বী লেখক আবুল ফজল সাহেবের রচিত ‘মানবপুত্র বুদ্ধ’ গ্রন্থ আজ ও দেদীপ্যমান হয়ে আছে। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, “এসো বিদ্রোহী তরুণ তাপস আত্মশক্তি বুদ্ধবীর / আনো উলঙ্গ সত্য কৃপাণ বিজলি ঝলক ন্যায় অসির ।” (Bisher Bashi, Page 38)!

প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে বুদ্ধের মুখনিসৃত বাণী এই প্রথমবারের মতো বড়ুয়া বৌদ্ধরা বাংলা অনুবাদ করে  বাংলা সাহিত্যকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছেন’। নানা ষড়যন্ত্রের দুর্ভেদ্য প্রাচীর বিদীর্ণ করে গৌতমবুদ্ধের শিক্ষা প্রচারে  ‘পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মূখ্য ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র ত্রিপিটক বোধিদর্পন প্রকাশনীর মাধ্যমে ৫৯ খণ্ডে বাংলা অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে সংযুক্ত হলো।  পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মূখ্য ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র ত্রিপিটক বোধিদর্পন প্রকাশনীর মাধ্যমে ! পূর্ণাঙ্গ ত্রিপিটক প্রকাশনা ও বিতরণ অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির আয়োজনে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বৌদ্ধদের সর্ব্বোচ্চ ধর্মীয়গুরু সংঘরাজ ধর্মসেন  মহাথের।

প্রাচীন বাংলাদেশে মহাস্থানের পুন্ড্রবর্দ্ধনে (বগুড়া) এবং পাহারপুরে (রাজশাহীর সোমপুরী বিহার) বসে গৌতমবুদ্ধ দিনের পর দিন বাঙালি সমাজকে দান, শীল, ভাবনা এবং সুন্দর ভাবে জীবন যাপনের শিক্ষা দিয়েছেন এবং স্মৃতির মনিমালায় পোড়ামাটির শিল্পকর্মে  “গৌতমবুদ্ধ ধর্মচক্র মূদ্রায়” আজ ও বাংলাদেশে বিরাজমান।  বাংলাদেশে বৌদ্ধ পালরাজাগণ চারশত বছর রাজত্ব  করেছিলেন এবং  ১০৪১ সালে অতীশ দীপংকর  তিব্বতে যাবার পর বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বৌদ্ধ ত্রিপিটক ও  বৌদ্ধধর্ম রাতারাতি কোথায় হারিয়ে গেল?   বাংলাদেশের জনতা পলিটিক্যাল নানা ষড়যন্ত্রের দুর্ভেদ্য প্রাচীর বিদীর্ণ  করে বাংলা ভাষা ও জয়  বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার  ইতিহাস!

কোন হিন্দু মন্দিরে সকাল বিকাল বুদ্ধ পূজা না করে ও গৌতমবুদ্ধ হিন্দু রাজনীতির অবতার হ’ল কি কারনে?  ধর্মের গোড়ামি ত্যাগ করে রামায়নের ঐতিহাসিক উৎস নিরুপণ করতে গিয়ে পন্ডিত ও ভাষাতত্ত্ববিদ ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির এক আলোচনা সভায় বলেছেন, “দশরথ জাতকই রামায়নের উৎস ( দৈনিক বসুমতি, কলকাতা, ২ মার্চ ১৯৭৮ ইং)।” “দশরথ জাতকই রামায়ন  ও হিন্দু ধর্মের উৎস ! কোন ব্রাহ্মণ শূদ্রকে হত্যা করলে কুকুর বিড়াল হত্যার সমান পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবেন (মনুস্মৃতি ১১/ ১৩২)! নয়জনের বুদ্ধগয়া ম্যানেজম্যান্ট কমিটিতে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সহ আর ও চারজন হিন্দু সদস্য কেন?   ভারতে  জৈন, মুসলমান, শিখ এবং খৃষ্ঠান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কোন হিন্দু সদস্য নেই। হিন্দুরাজনীতির “বুদ্ধগয়া দখল ট্রাজেডি !

আমার লেখা কবিতায়,  মনে মৈত্রী করুণ রস, বাণী অমৃত পদ। জনে জনে হিতের তরে, পড়েন জীবনযুদ্ধে বৌদ্ধ   ত্রিপিটক /  পবিত্র  বৌদ্ধ  ত্রিপিটক  প্রকাশনী দিবসে চোখে আসে পানি- /  এসো স্মরণ করি কুরবানি  / পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মূখ্য ধর্মীয় গ্রন্থ  / শুক্রবার  ০৮ ডিসেম্বর বিকেলে/নগরীর চান্দগাঁও সার্বজনীন শাক্যমুনি বিহারে! হে আমার বাঙালি ভাই বোন!   /   গৌতমবুদ্ধের   ডাকে আমি আত্মহারা  /   রাজত্ব  করেছিলেন  বাংলাদেশে বৌদ্ধ পালরাজাগণ চারশত বছর /  বৌদ্ধ   ত্রিপিটক  একটি জাতির পরিচয় ও অস্তিত্বের অভিনব স্বাক্ষর।

কর্নাটকের রাজা বিজয় সেনের বাংলাদেশ দখল করাতে একাদশ শতাব্দীতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো।   ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতায় ‘বৌদ্ধ মুক্তিযুদ্ধে চর্যাপদের উৎপত্তি।   বহিরাগত সেন রাজারা যে চারশ বছরের পাল সাম্রাজ্যের সমদর্শী সংস্কৃতি ও প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের বিলোপ ঘটিয়েছে।  বাংলা বর্ণমালার ইতিহাসে ( প্রায় 2600 বছর পূর্বে ) বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতমবুদ্ধ বাল্যকালে যে বাংলা লিপি অধ্যায়ন করেছিলেন তা বাংলা বিশ্বকোষে (১৩শ ভাগ, পৃঃ ৬৫ ) সগৌরবে লিপিবদ্ধ  এবং  ইতিহাসে দেদীপ্যমান হয়ে আছে। বিজয় মাসে বৌদ্ধদের ঐতিহাসিক সমগ্র ত্রিপিটক প্রকাশিত হলো!

মনস্তত্বের দৃশ্যকাব্যের মতো  হিন্দু রাজনীতির নানা ষড়যন্ত্রে প্রাচীন বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ  by force মুসলমান হয়েছিলেন  (পৃষ্ঠা 51 প্রদোষে প্রাকৃতজন ) in 1202 A.D. ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতায়  আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো  চর্যাপদে আমরা দেখতে পাই সেন আমলে  সর্বগ্রাসী হিন্দু রাজনীতি  গায়ের জোরে উচ্চবর্ণের হিন্দু শাসকগণ বৌদ্ধগণকে দলিত বানিয়েছিলেন ( দেশ, ৪ মে ২০০১ কলিকাতা পৃষ্ঠা ১২) !  এবং চর্যাপদের  প্রথম মুক্তিযুদ্ধে আমার দেশ  প্রসঙ্গ !  হিন্দুরাজনীতি  ধর্মের অপব্যবহার করে লেখাকে নরকের দ্বার স্বরূপ ফতোয়া জারি করে  বৈদিক ব্রাহ্মণগণ বিধান দিলেন, “স্বরস্বতী বাগদেবী, লিপির দেবী নয়। দেবভাষায় কোন লিপি নেই (দেশ. ১৪ পৃষ্ঠা, কলকাতা, ১ ফেব্র“য়ারী ১৯৯২)।” গৌতমবুদ্ধ দক্ষিন এশিয়ার এই সামাজিক বিকৃতির হাত থেকে জনতাকে রক্ষা করেন।  দুই হাজার পাঁচশো একষট্টি বছরের বৌদ্ধ ইতিহাসে বাংলা ভাষা, বাংলা বর্ণমালা এবং বঙ্গাব্দ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঐতিহাসিক রক্তাক্ত প্রান্তরের স্বাক্ষী বাংলা ভাষার আদিমতম নিদর্শন বৌদ্ধ চর্যাপদ। গৌতমবুদ্ধের অহিংস নীতিতে দীক্ষা নিয়ে সম্রাট অশোক  (মানবাধিকারের ঘোষণা ছিল ‘বৌদ্ধ ত্রিপিটক) ”অহিংসা পরম ধর্ম” শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, কথাশিল্পী শওকত আলীর  (“প্রদোষে প্রাকৃতজন)  ভয়াবহ বর্ণনা  “তুর্কী আক্রমন অত্যাসন্ন। তবু সামন্ত-মহাসামন্তদের অত্যাচারের শেষ নেই। সেই অত্যাচার রুখে দাঁড়ায় কখনো অন্ত্যজেরা, কখনো বৌদ্ধেরা। সেনরাজার  শাসন থেকে স্খলিত হয়ে যাচ্ছে দেশ, শাসকদের বিশেষ রোষ তাই তাদের উপরেই। তাদেরই একজন প্রশ্ন করে: “দেখো, এই কি মানুষের জীবন? সুখ নেই, স্বস্তি নেই, গৃহ নেই, কেবলই প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে হচ্ছে – এর শেষ কোথায়? এ জীবন কি যাপন করা যায়? বলো, কতদিন এভাবে চলবে?”   বাঙালি জাতির দুর্লভ স্বাধীনতা সাত পাঁকে বাঁধা কেন? মহাবিপদের দুর্গম গিরী কান্তার মরু দুস্তর পারাবার অতিক্রম করে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তানের পুঞ্জীভুত পাপরাশি থেকে মুক্তি পেতে আমার স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের ডাক দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। অনন্ত রক্তস্রোতে ভেসে যায় বাংলাদেশ।

একদা হিন্দুধর্ম ত্যাগ করার পর সম্রাট অশোকের প্রার্থনা ছিল, “বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি।” ভূপালে সাঁচীর তোরনদ্বারের দক্ষিন তোরণের পশ্চিমের স্তম্ভের মাঝের দুটো প্যানেলে সেই মহামতি সম্রাট অশোকের  তীর্থভূমি বুদ্ধগয়ায় মহাবোধিবৃক্ষে  বুদ্ধ বন্দনার অমর এ্যালবাম আজ ও অম্লান হয়ে আছে।    বুদ্ধং সরনং গচ্ছামি”র কাছে নিজেকে নিবেদন এবং বুদ্ধের উপদেশ ছিল, “যে আমার দেহকে দেখে সে আমাকে দেখে না, যে আমার উপদেশ মেনে চলে সে আমাকে দেখে ও মেনে চলে।  ভারতীয় যে কোন ভাষায় পালি ত্রিপিটক বা সংস্কৃত ভাষার পরিপূর্ণ ত্রিপিটক না থাকার কারন কি? সাবেক Indian  প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর রচিত “ভারত সন্ধানে” (ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া) শীর্ষক গ্রন্থে ১৫০ পৃষ্ঠায় ”হিন্দু ধর্ম কি ভাবে বৌদ্ধধর্মকে অর্ন্তভ্ক্তু করে” প্রশ্নটা প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আঁন্দ্রে ম্যালরো জওহরলাল নেহেরুকে করেছিলেন। রাজা লক্ষন সেনের সভাকবি উমাপতি ধর পরে বখতিয়ার খিলজির সভাকবি হলেন কেন?  মানব সভ্যতা বা মানব জাতির জীবন নদী স্থির নয়, সদা অনিত্য পরিবেশে চ ল ও চলমান। ”বুদ্ধের উপদেশ ছিল, “যে আমার দেহকে দেখে সে আমাকে দেখে না, যে আমার উপদেশ মেনে চলে সে আমাকে দেখে ও মেনে চলে।“ বৌদ্ধ চর্যাপদ Meditation & তান্ত্রিক মতে, গুহ্য নাভি মূলকে বলা হয় নির্মানচক্র, হদয়ে ধর্মচক্র, কন্ঠে সম্ভোচক্র, মস্তিষ্কে মহাসুখচক্র। দেহের নাড়িকে সংযত করার সাধনা তান্ত্রিক সাধনা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বজ্র্রকন্ঠে ধ্বনিত হয়, ”আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের  মারতে পারবে না।”  বাংলা ভাষার প্রথম বইয়ের নাম “চর্যাপদ এবং শুধু  নাম নয়,  একটি জাতির পরিচয় ও অস্তিত্বের অভিনব স্বাক্ষর। ইতিহাস সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয় ঘোষণা  করে। মনে মৈত্রী করুণ রস, বাণী অমৃত পদ। জনে জনে হিতের তরে, পড়েন ‘শহীদ দিবস, ‘বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন,  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী এবং চর্যাপদ!”  নানা ষড়যন্ত্রের দুর্ভেদ্য প্রাচীর বিদীর্ণ করে গৌতমবুদ্ধের শিক্ষা প্রচারে পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাংলা বইয়ের নাম “চর্যাপদ।

 

লেখক সোনা কান্তি বড়ুয়া  সাবেক সভাপতি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, টরন্টো, খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, কথাশিল্পী, বিবিধগ্রন্থ প্রনেতা প্রবাসী কলামিষ্ঠ, লাইব্রেরীয়ান, বিশ্ববৌদ্ধ সৌভ্রতৃত্ব পত্রিকার সহ সম্পাদক এবং জাতিসংঘে বিশ্ববৌদ্ধ প্রতিনিধি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.