khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

সোনা ঝরা স্মৃতি

0 104

 

রুমী কবির

আনিসুল হক, আমরা তাকে ‘বাবলু ভাই’ নামে চিনি। সেই বাবলু ভাই চলে গেলেন সবাইকে কাঁদিয়ে।

বাবলু ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোন উঠাবসা ছিল না বয়সের ব্যবধানের কারণে। তবে তার বাবা শরিফুল হক চাচা, আমার বাবা এম এ কবির, সাংবাদিক ও নাট্যকার সাইদ তারেক ভাইয়ের বাবা মুসলিম কাকু- উনারা সবাই আনসার বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মকর্তা ছিলেন।

সেই সুবাদে এখনও যতদূর মনে পড়ে, তারা একই সঙ্গে জামালপুরের মহকুমা আনসার অফিসে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘ কয়েক বছর। আর সে কারণে পারিবারিকভাবে বাবলু ভাইদের সঙ্গে আমাদের ছিল সুন্দর সম্পর্ক।

সেই ছোটবেলার অনেক ঘটনার সঙ্গে বাবলু ভাইদের বাসার স্মৃতিটা আজ বেশি মনে পড়ছে। আমি তখন বালক বয়সী। ক্লাস ওয়ান, টু বা থ্রি’তে পড়তাম। ৬৬, ৬৭ কি ৬৮ সাল। সেবার ১৪ অগাস্ট তৎকালীন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের নৌকা বাইচ দেখতে গিয়েছিলাম বাবলু ভাইদের বাসায়।

জামালপুর গার্লস স্কুলের উল্টোপাশের পুলিশ ক্লাবের বিশাল বকুল গাছের নিচ দিয়ে পোস্ট অফিসের পাশ দিয়ে রাস্তাটা ধরে কিছুদূর গেলেই বাম দিকের ব্রহ্মপুত্রের পারে ছিল ওনাদের বাসা। তারেক ভাইদের বাসাটা ছিল টেনিস মাঠের পাশে, সেটাও ছিল নদীর তীর ঘেষে।

ওই বাসায় সেদিন নৌকা বাইচ দেখতে দেখতেই বাবলু ভাইয়ের শান্ত দীপ্ত, মেধাসম্পন্ন এক তারুণ্যের ছবি দেখেছিলাম, এখনও মনে পড়ে সেটা। ঢাকায় পড়াশোনা করতেন বলে তাকে খুব একটা দেখা যেতো না ওই বাসায়। আমাকে গাল ছুঁয়ে আদর করে মুচকি হাসি দিয়েছিলেন, এখনও স্পষ্ট কিংবা আলো-আঁধারির মতো মনে আছে সেই ছবিটা।

এরই এক ফাঁকে দেখি বেলাল ভাই আমার সাথে ভাব বিনিময় করতে এগিয়ে আসছেন। তিনি সবার ছোট ভাই, বর্তমানে সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বেলাল ভাই খুব ছুটাছুটি করতেন। সম্ভবত আমার চেয়ে দু’এক বছরের বড় ছিলেন তিনি। মনে পড়ছে, আমাকে ছোট ছেলে হিসেবে আদর করতে গিয়ে ওদের উঠোনে গাছের জাম্বুরা পেড়ে আমাকে দিয়েছিলেন।

বেলাল ছাড়াও বাবলু ভাইয়ের আরও দুই ভাই ছিলেন একজনের নাম সম্ভবত হেলাল, অন্যজন ইকবাল। ওদের একটি বোন ছিল নাম জেসমিন। ওদের মা’কে বেশ কয়েকবার সেদিন ‘জেসমিন জেসমিন’ বলে ডাকাডাকি করতে শুনেছি। বেশ মজাই লাগতো চাচির কথাবার্তা ও আদর আপ্যায়ন।

মনে আছে সেদিন আমার আব্বাও ব্রহ্মপুত্রের বুকে অসংখ্য নৌকার মাঝে একটি বিশাল সাইজের পরিপাটি সাজানো নৌকার সামনে বসেছিলেন। আনসার দলেরও একটা নৌকা প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, তাই ওরা আব্বাকে সামনে বসিয়ে দিয়েছিল। সেইসঙ্গে ঐতিহাসিক নৌকা বাইচের ঢাক ঢোলের বাজনা বাজছিল যাতে মাঝিরা শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। সেদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। পুরো ব্রহ্মপুত্র নদ জুড়ে তখন শুধু নৌকার ছড়াছড়ি আর শরীর ঝুঁকে ঝুঁকে বাজনার তালে তালে উদ্দীপনার বৈঠা নাড়া।

আনসারদের নৌকাটি যখন বাদ্যের তালে তালে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল বাবলু ভাইদের বাড়ির পাশ দিয়ে, আমার আম্মা তখন আমাকে ও আমার অন্যান্য ভাই বোনদের ডেকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিলেন উৎসাহের সাথে।

বাবলু ভাই সেদিন দু’একবার নৌকা বাইচের রেস বারান্দায় ছুটে এসেছিলেন, আবার চলে গেছেন পড়ার টেবিলে। স্মৃতিগুলো কখনো সুস্পষ্ট আবার কখনো অস্পষ্ট, যেন ছিটকে ছিটকে আসছে ছবির মতো।

বাবলু ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা ও দেখা হয়েছিলো আশির দশকের শুরুতে তাদের ঢাকার বাসায়। যদিও ততোদিনে আমাকে ভুলে গেছেন, চেনার কথাও নয়। কারণ পরে আর যোগাযোগ ছিল না। তবে পরিচয় দেওয়ার পর চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি।

সেই চেনা স্মিত হাসি, কুশল বিনিময়। কেমন আছি, কি করছি এইসব জানতে চাইলেন। দু’বার যেতে হয়েছিলো সেই সময়টায়। প্রথমবার ছিলেন না, তিনি ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলেন। তবে তার কাছেই গিয়েছিলাম তা নয়, গিয়েছিলাম তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে। সঙ্গে আমার আম্মাও ছিলেন।

আমার আব্বা তখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচল হয়ে পড়েন। আনসার বিভাগের চাকরি থেকে অনেক আগে অবসর নিলেও অন্য একটা বিদেশি কোম্পানিতে ছিলেন। তাই বাবার সংকটে আমাদের সংসারেও এসেছিল আর্থিক সংকট। শরিফুল হক চাচা আব্বাকে ভীষণ স্নেহ করতেন।

যদিও তিনি আনসার বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছিলেন অনেক আগে, তবু সেদিন আমাদের পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন চাচা। আমার ছোট ভাইকে আনসার সদর দপ্তরে একটি সাময়িক চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমার সেই ভাই পড়ালেখার ফাঁকে বেশ কয়েক মাস কাজটি করেছিল।

যাই হোক, প্রয়াত আনিসুল হক বাবলু ভাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অনেক ঘটনাই ছুটে আসে অবাধ্যের মতো। একজন জনপ্রিয় উপস্থাপক, সফল ব্যবসায়ী নেতা, উদ্যমী নগরপিতা ও শৈল্পিক চেতনার নির্মল আলোয় উদ্ভাসিত প্রিয় মানুষ! এভাবে চলে গেলেন হঠাৎ করে!

বিদায় বাবলু ভাই। এ বিদায় মেনে নেওয়া খুব কষ্টের, কিন্তু মেনে নিতে হচ্ছে। আল্লাহ তার বেহেস্ত নসীব করুন। পরপারে ভালো থাকুন আমাদের প্রিয় বাবলু ভাই।

 

 

 

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply