khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের উৎস-অনুসন্ধান

0 22

রুদ্র সাইফুল:  সাধারণভাবে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা খোঁজা হয় ভাষা আন্দোলনের উৎসভূমি থেকে। বলা হয়, ভাষা আন্দোলন বাঙালিদের মধ্যে যে চৈতন্য জাগিয়েছিলো তা তাদেরকে টেনে নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাসের বিশ্লেষণে ভাষা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা বলা যেতে পারে। কিন্তু উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে সুপ্রাচীনকাল থেকেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর স্বাজাত্যবোধ স্বাভাবিকভাবেই স্থান করে নিয়েছিলো বাঙালিদের মনে। ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাক্রম যদি অস্বীকার না করি তবে মানতেই হবে, আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিলো পরাভব না মানা মুক্তি প্রত্যাশী বাঙালিদের অবধারিত পরিণতি। কারণ হাজার বছর ধরেই বাঙালি তার সংগ্রামী চেতনাকে ধারণ করে এগিয়েছে।

ভারত-ভূমিতে বিদেশি শক্তির আবির্ভাব বৈদিক সাহিত্যের সূত্রে দুই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে দৃশ্যমান হয়েছে। আর্য-শক্তি গ্রাস করেছিলো ভারত-ভূমি। এক হাজার বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সুসংহত অবস্থান তৈরি করে চলছিলো আর্যরা। কিন্তু প্রাচীনকালে বাঙালিরা নিজেদের আত্ম-মর্যাদাবোধকে বিকিয়ে দেয়নি। বাঙালিদের বীরত্ব যে আর্য আগমনকে রুখে দিয়েছিলো তা বৈদিক সাহিত্যে পরাজিতদের ক্ষোভ থেকেই বোঝা যায়।

ভারত উপমহাদেশে সাম্রাজ্যের আদলে বিশাল রাজ্যপাট খুলে বসে প্রথমে মৌর্য ও পরে গুপ্ত রাজারা। এ পর্বে বাঙলা মৌর্য ও গুপ্তদের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের মর্যাদা পায়। কিন্তু বিদেশি শাসকদের অধীনতায় স্বস্তিতে ছিলো না বাঙালিরা। বাঙলার কোনো-কোনো অঞ্চলে তারা সুযোগ মতো স্বাধীন রাজত্ব গড়ার প্রয়াস পেয়েছে। গুপ্ত-পরবর্তীকালে বাঙলায় কয়েকটি স্বাধীন রাজত্বের উত্থান ঘটে।

৬০৬ সালে গুপ্ত অধিকৃত গৌড়কে স্বাধীন করেন শশাঙ্ক। গৌড়ের শক্তিকে তিনি বিস্তৃত করেন উত্তর ভারত পর্যন্ত। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ১০০ বছরের অরাজকতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো বাঙলা। কিন্তু হতাশা বিপন্ন করতে পারেনি বাঙালিদেরকে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামী অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যয়ের জন্ম দিয়েছিলো। অন্ধকার থেকে জাতিকে আলোতে ফিরিয়ে আনতে হলে চাই সঠিক নেতৃত্ব। এ উপলব্ধিতে সচেতন ছিলো বাঙলার সাধারণ মানুষ বা অভিজাতবর্গ। তাম্রশাসনে যাদের বলা হয়েছে ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’। তারা সেই দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ সময়ে ইতিহাসের অচেনা গোপালকে এনে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছিলেন। মানুষের নির্বাচন যে ভুল হয় না গোপাল তার প্রমাণ। অচিরেই গোপাল অরাজকতার অবসান ঘটালেন। প্রতিষ্ঠিত হলো পাল সাম্রাজ্য। প্রায় ৪০০ বছর পাল বংশের শাসনকাল অব্যাহত ছিলো। এভাবে স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালিরা প্রথম বৃহত্তর ভূখণ্ডজুড়ে নিজেদের স্বাধীন রাজত্ব পেলো। পালদের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব বাঙলায় প্রতিষ্ঠিত হয় কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য।

ধীরে-ধীরে দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আসা সেন বংশের সেনা-পুরুষরা গ্রাস করে বাঙলা। সেন শাসন বলে পরিচিত এই বিদেশি শক্তি শতাধিক বছরের জন্য বাঙলার স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে। ব্রাহ্মণ সেন রাজাদের তীব্র শোষণ চলতে থাকে বাঙলার সাধারণ হিন্দু-বৌদ্ধ জনগণের ওপর। সরব প্রতিবাদের সামর্থ্য না থাকলেও সেন শাসনযুগে বিক্ষুব্ধ হতে থাকে বাঙালিরা। তার প্রকাশ অনুভব করা যায় তের শতকের শুরুতে। তুরস্কের মুসলমান সেনাপতি বখতিয়ার খলজির নেতৃত্বে যখন অনায়াসে সেন রাজারা বিধ্বস্ত হয় বাঙলার সীমানায় তখন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করেনি। সেন শাসনে তারা এতটাই বিপন্নবোধ করেছিলো যে, অবাঙালি মুসলমান শাসকদের মুক্তির অগ্রদূত ভেবেছিলো।

এভাবে অচিরেই বাঙলা অবাঙালি মুসলমান শাসনাধীনে চলে আসে। এই মুসলমান সুলতানরা কর্মভূমিকার মধ্য দিয়ে অচিরেই শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। প্রথমে এরা এসেছিলেন দিল্লির মুসলমান সুলতানদের গভর্নর হয়ে। বাঙলার মাটিতে তারা অচিরেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাদের স্বাধীনতা পাকাপোক্ত হয় ১৩৩৮ সাল থেকে। টানা ২০০ বছর তথাকথিত স্বাধীন সুলতানদের শাসন অব্যাহত ছিলো। বাঙালিদের শোষণের জন্যই সুলতানরা তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছেন। এরপর আফগানদের স্বল্পকালীন শাসন এবং পূর্ব বাঙলার বারো-ভূঁইয়াদের শাসনকাল বাদ দিলে বাঙলা চলে যায় দিল্লির অধীনতায় মুঘল প্রাদেশিক শাসন কাঠামোয়। মুঘল শাসকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের হাত থেকেই ব্রিটিশরাজের শাসনপর্ব চলে।

ব্রিটিশ শাসনপর্বে বাঙালির ইতিহাস স্বাধীনতা সংগ্রামেরই ইতিহাস। ধীরে-ধীরে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব দানাবাঁধে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে সম্মানিত হয় বাঙলা। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী মহাঅভ্যুত্থান ইংরেজ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। পলাশীর বিপর্যয়ের পর থেকেই স্বাধীনতাপ্রত্যাশী বাঙালিরা ক্রমাগত সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলো। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত চলে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন। ১৮৫৯-৬০ সালে সংঘটিত হয় নীল প্রতিরোধ আন্দোলন, তিতুমীরের আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন প্রভৃতি। এসব আন্দোলন রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর বাঙলায় কয়েকজন শিক্ষিত উদার মনের নেতার আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে বাঙালিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন জাতিকে শিক্ষিত করতে না পারলে বিদেশি শক্তির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। একই কারণে তারা অনুভব করেছিলেন কুসংস্কারমুক্ত করে সামাজিক জীবনে প্রয়োজন আমূল সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা। এ প্রেক্ষাপটে মহান দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হাজী মুহম্মদ মুহসীন, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ ব্যক্তিত্ব।

এভাবে বাঙালির মধ্যে যে সচেতনতা সৃষ্টি হয় তাতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। আর তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতব্যাপী। এমনভাবেই একদিন ভারত ছাড়তে হয় ব্রিটিশরাজকে। ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত করে দিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যায় ব্রিটিশ শাসকরা। কিন্তু নতুন দেশের জন্মলগ্ন থেকেই এক অদ্ভূত স্বাধীনতার কটুস্বাদ পেলো পূর্ব বাঙলার বাঙালিরা। হাজার মাইলের ব্যবধান সত্ত্বেও দুই খণ্ডের পাকিস্তান দেশটির অধিবাসী হলো তারা। রাজদণ্ড চলে গেলো উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। আরেক ধরণের শোষকের হাতে বন্দি হয় পূর্ব বাঙলার মানুষ। আবার আন্দোলনে নামতে হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে আসে বাঙালির মহান অর্জন। আর এই পথ ধরেই হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে বাঙালিরা অধিকার আদায়ের আন্দোলন শানাতে থাকে। অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কোনো আপস-চিন্তায় আসতে পারেনি পাকিস্তানি শাসকচক্র। তাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই অধিকার আদায়ের আন্দোলন অচিরেই স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। অবশেষে ইতিহাসের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা রক্তমূল্যে অর্জন করে তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, লাল-সবুজের বাংলাদেশ। এই যে লড়াকু বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক ঐতিহ্য তার পেছনে একমাত্র চালিকাশক্তি ছিলো দেশপ্রেম। এই শক্তিকে লালন করে, ধারণ করে একটি জাতি অনেক বড় উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

এই নিবন্ধে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করবো, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন নিয়ে আলোচনা করবো।

১৯৪৭-এর বাঙলা ভাগের বিষয়টি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি মুখ্য বিষয় হিসেবে দেখা দেয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের চাপে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে এই ভূখণ্ডে ভাগের রেখা টেনে দেয় ব্রিটিশরাজ। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সংস্কৃতির মানুষগুলোকে একটি দেশের পতাকাতলে নেওয়ার জন্য ব্রিটিশরাজের কূটকৌশল সেই সময়ে সফল হয়েছিলো। ভাগ হয়েছিলো ভারতবর্ষ, দুটি দেশে রূপান্তরিত হয়েছিলো, ভারত ও পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্বিচারে শোষণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে থাকে বাঙালিরা।

বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ, সত্যরঞ্জন বকশী, সত্যগুপ্ত, মাস্টারদা সূর্যসেন, পূর্ণ দাস, যতীন দাস, পঞ্চানন চক্রবর্তী, প্রতুল ভট্টাচার্য, জগদীশ চ্যাটার্জী, বিনোদ চক্রবর্তী, যতীশ জোয়ার্দার, বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত, ননী চৌধুরী, সৌরভ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, গনেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, আবদুল খালেক, শেরে বাঙলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র রাজনৈতিক বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় একটি নাম, বাঙালি জাতির সেতুবন্ধন বিত্তশালী চিত্তের অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় বাঙালি, গড়ে ওঠে পাকিস্তান বিরোধী তুমুল গণ-আন্দোলন, আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আমরা পেলাম এক টুকরো বাঙলা, আমাদের রক্তের দামে কেনা বাংলাদেশ; লাল সবুজের পতাকায় ঢেকে যায় আমাদের প্রিয় ভূখণ্ড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন একদিনেই তৈরি হননি, ঠিক একইভাবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতার ফসল ‘বাংলাদেশ’।

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যাক্ট’-এ ভারতবর্ষের দুটি প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়। ১২ আগস্ট প্রকাশিত ‘র্যা ডক্লিপ রোয়েদাদ’-এ পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে রক্তপাত, পারষ্পরিক ঘৃণা ও ধর্মীয় ছলনাময়ী তথাকথিত ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’র ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের বিভাজনে বাঙলা ভূখণ্ডটিও বিভক্ত হয়ে পড়ে পূর্ব ও পশ্চিম বাঙলা নামের আড়ালে। পূর্ব বাঙলায় থেকে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ, রাজশাহী বিভাগের রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলা; প্রেসিডেন্সি বিভাগের খুলনা জেলা, চারটি থানা ছাড়া সিলেট; নদীয়া, যশোর, পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও মালদা জেলার অঙ্গচ্ছেদ করা হয়। বাঙালিরা অনেক সম্ভব-অসম্ভবের বুক-বাঁধা আশা নিয়ে, জিন্নাহ’র উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম উৎপীড়নের মিথ্যা অভিযোগ মেনে নিয়ে ‘ধর্ম-ভিত্তিক’ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়।

পাকিস্তান তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই বাঙলার জনগণ অনুভব করলেন, যে আশা নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে, সে আশা পূর্ণ হওয়ার নয়। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ প্রথমেই বাঙলায় সাংস্কৃতিক আঘাত শুরু করে। এই সূত্রেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় বাঙলার ছাত্রসমাজের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকাই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত।

১৯৪৭ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। এই সময় বাঙলার বুদ্ধিজীবী এবং বাঙলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তাৎক্ষণিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ শুরু করে। এরই সূত্রে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। কালক্রমে এই আন্দোলন সমগ্র বাঙলার জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর পুলিশ গুলি করে। শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে।

১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। কিন্তু পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বাঙালির এই আধিপত্য মেনে নিতে পারেনি। এই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২২৩ আসন। কিন্তু মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে সামরিক শাসন জারি করা হয়। ঐদিন বঙ্গবন্ধু করাচি থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং গ্রেফতার হন। ২৩ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। উল্লেখ্য, যুক্তফ্রন্ট এই নির্বাচন উপলক্ষে যে নির্বাচনী কর্মসূচি দিয়েছিলো তা একুশ দফা নামে পরিচিত। এরপর ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক সরকার ১৯৫৯ সালে সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করে। এর ফলে বাঙালিদের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়ে যায়। পুরো জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ বাঙালি, অতএব এই নির্বাচনের ফলাফল চিন্তা করে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। একই সময়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের কৌশলে কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেও বিরোধ সৃষ্টি করে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশে সামরিক শাসন জারি করে এবং সকল ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন তুলে নেওয়া হয়। পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে এই সময় দেশব্যাপী একটি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের সূচনা করে শিক্ষার্থীরা।

পাকিস্তানের কাঠামোয় বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটা অসম্ভব বিবেচনা করে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গোপনে ছাত্রদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ এই সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ এবং রাশেদ খান মেনন। এই সংগঠন ‘স্বাধীন বাঙলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে পরিচিত ছিলো। ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন ও সব রকমের সহযোগিতা প্রদান করে বাঙলার প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৬৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, ‘শিক্ষা দিবস’ পালন উপলক্ষে মিছিল বের করা হয়। এইদিন আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিলের উপর পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। গুলিতে তিনজন ছাত্র নিহত হন। এঁরা হলেন ওয়াজিউল্লাহ, মোস্তফা ও বাবুল।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়কালে দেখা যায়, বাঙলাকে প্রায় অরক্ষিত রেখে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাকে সুদৃঢ় করা হয়েছিলো। এই যুদ্ধ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের ধারাবাহিকতায় বাঙলার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ন্যূনতম উন্নতি করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের প্রতি জাতিগত এই বৈষম্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে লাহোরে আহুত ‘সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলন’-এ তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে এই ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলনকে ভিন্নমাত্রা দান করেছিলো। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্য আওয়ামী লীগের সহযোগীতায় লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেমের নেতৃত্বে বাঙলাকে বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের এক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। সংগঠনের নৌ-বাহিনীর কোনো এক সদস্যের অসতর্কতার ফলে পাকিস্তান সরকারের কাছে এই পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে, ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকার সামরিক-বেসামরিক ২৮ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এক রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করে। এই মামলা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত।

১৯৬৮ সালের ১৯ জুন, ঢাকা সেনানিবাসে এই মামলার বিচার শুরু হয়। বিচারকার্য চলার সময় থেকেই স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে, ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ এই গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বলা যায়, দেশব্যাপী সরকার বিরোধী আন্দোলন পূর্ণতা লাভ করে এবং ধীরে ধীরে বাঙলার স্বায়ত্বশাসনের দাবি প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এইসূত্রে সে সময়ের রাজনৈতিক স্লোগানও পরিবর্তিত হয়। যেমন, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা।’ ‘জাগো জাগো, বাঙালি জাগো’। এই ধারাবাহিকতায় স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে উন্মূক্ত করে। এই আন্দোলন শুরুতে অহিংস আন্দোলন ছিলো, ক্রমান্বয়ে তা সহিংসতার দিকে ধাবিত হতে থাকে। ফলে ছয় দফা দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়। আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে। মূলত এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ছাত্র-সমাজ। ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, সামসুদ্দোহা, মোস্তফা জামাল হায়দরসহ অনেকে। ছাত্রদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো সে সময়ের নানা পেশার মানুষ। এই আন্দোলনের তীব্রতা বুঝা যায়, সে সময়ের আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের তালিকা দেখলে। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ২৪ জানুয়ারি স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকায় শহীদ আসাদ-মতিউর দুটি উল্লেখযোগ্য নাম। শেরে বাঙলা নগর ও মোহাম্মদপুরের সংযোগ স্থলের আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে ‘আসাদ গেট’ এবং বঙ্গভবনের সামনের উদ্যানের নাম ‘মতিউর রহমান শিশু উদ্যান’ করা হয়।

১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত অবস্থায় বন্দী আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক মৃত্যুবরণ করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এই দুটি মৃত্যু সংবাদ গণ-আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এই মামলায় অভিযুক্ত ও বন্দী অবস্থায় সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ড. শামসুজ্জোহাকে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। উভয়েই স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হিসাবে চিহ্নিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ শামসুজ্জোহা হল’ তাঁদের স্মরণে নামকরণ করা হয়েছে।

প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্ত সকলেই ঢাকা সেনানিবাস থেকে মুক্তি লাভ করেন। ধারাবাহিক এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির একক এবং অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল গণ-সম্বর্ধনায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে কিংবদন্তির ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৭০ সালের ২৫ মার্চ তিনি সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে হস্তান্তর করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খানও গণ-দাবিকে উপেক্ষা করার মত শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সারাদেশে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। তিনি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার তফসিল ঘোষণা করেন।

পূর্ব ঘোষিত তফসিল অনুসারে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে বাঙলার গণ-মানুষের স্বতস্ফূর্ত ভোটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের উত্তরণ ঘটে। বাঙলার জনগণ প্রত্যাশা করেছিলো নির্বাচিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে বাঙলার দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসের গতি পাল্টাবেন। পাকিস্তানের শাসকবর্গ ষড়যন্ত্রের গ্রন্থিগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যেনো শাসন ক্ষমতা কোনোক্রমেই বঙ্গবন্ধুর হস্তগত না হয়। বাঙলার জনগণ তা সঠিকভাবে অনুধাবন করেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি লক্ষ্য করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনুভব করেছিলেন যে, খুব শীঘ্রই পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি দেশ সম্পৃক্ত হতে চলেছে এবং এর জন্য কঠিন লড়াই করতে হবে। এরই সূত্র ধরে ১৯৭০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে সার্জেন্ট জহুরুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, একটি সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে এবং এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই বঙ্গবন্ধুর অনুমতিক্রমে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে একটি ব্রিগেড গঠন করা হয়েছিলো। এই বাহিনীর নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘জয় বাঙলা’। প্রথাগতভাবে তখন এই বাহিনীর জন্য একটি পতাকা তৈরির পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছিলো। এই পতাকার নকশা কি হবে, তা নিয়ে ছাত্রনেতাদের মধ্যে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আ স ম আবদুর রব এবং শেখ মণি’র মত ছিলো পতাকার জমিনটা হবে সবুজ রঙের, যা শ্যামল বাঙলার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। শাহজাহান সিরাজ লাল রঙের পক্ষে ছিলেন। কাজী আরেফ পতাকায় ‘বাংলাদেশের মানচিত্র’ যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এই আলোচনার এক পর্যায়ে ছাত্রনেতা কামরুল আলম খান খসরু কালি-তুলি ও কাপড় জোগাড় করে ফেলেন। ছাত্রনেতাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, পতাকার বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য শিব নারায়ণ দাশ আসেন এবং একটি পতাকা তৈরি করেন। এই পতাকাটি তৈরি হওয়ার পর, তা নিরাপত্তাজনিত কারণে ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়। এই পতাকাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে গৃহীত হয়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের, তিনি দৃঢ়চিত্তে সেদিন বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাঙলা।’

বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার ফলে বাঙলাজুড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রস্তুতি, বাঙলার সাধারণ কৃষক, ছাত্র, মজুর, শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মুক্তিকামী মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে একত্রিত হতে শুরু করে।

১৯৭১ সালের শুরুর দিকে বাঙলার মানুষের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসকবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ধীরে ধীরে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে নেতৃত্বে বাঙলার স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ লাভ করে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে ‘বাংলাদেশ’ নামটি পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply