khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

রিকশাওয়ালাও কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে

0 24

রিকশাওয়ালাও কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে
ড. মুহাম্মদ সামাদ
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, জাতীয় কবিতা পরিষদ

প্রথম ঢাকায় আসি ১৯৬৯ সালে। সবে ক্লাস এইটে পড়ি। তখন ঢাকা ছোট, ছিমছাম একটি শহর। তেজগাঁও রেলস্টেশনে নেমে সেখান থেকে মহাখালী গিয়ে উঠি এক বন্ধুর বাসায়। কয়েক দিন ছিলাম ঢাকায়। বন্ধুর সঙ্গে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে গেলাম। দেখলাম বিহারিরা তিন তাস খেলছে আর টাকা জিতছে। আমাদেরও লোভ হলো। কিন্তু আমরা যতই খেলি, ততই হারি। তখনো বুঝতে পারিনি এটি পাতানো খেলা। হারতে হারতে দুই টাকা অবশিষ্ট রইল। চিড়িয়াখানা ঘুরে আমরা বাসে চড়ে বাসায় ফিরে এলাম। পরে অবশ্য বন্ধুর বাবা আমাদের টাকা দিয়েছিলেন। ঢাকা জাদুঘর দেখতে গিয়েছিলাম। এখন যেখানে এশিয়াটিক সোসাইটি, সেখানে ছিল ঢাকা জাদুঘর। শাঁখারীপট্টি ঘুরতে গেলাম। ফিরতি পথে এসএম হলও দেখলাম। ট্রেনে চেপে বাড়ি ফেরার সময় দেখেছিলাম মোনেম খাঁর বাড়ি। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। বনানীর বাড়িতে বারান্দায় হাঁটছিলেন তিনি। তাঁকে দেখামাত্রই সাধারণ যাত্রীরা ট্রেন থেকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল। তখন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান চলছিল। সেটি ছিল মানুষের ঘৃণার একটি বহিঃপ্রকাশ।

পরেরবার ঢাকায় আসি স্বাধীনতার পরে, ১৯৭৩ সালে। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা দেখতে এলাম। সেইবারও ঢাকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান চষে বেড়িয়েছি। রেসকোর্সে ছাত্রলীগের একটি সম্মেলনেও গিয়েছিলাম। তখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নাম হয়নি। উদ্যানের গাছগুলোও ছোট ছিল। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিলেন। বঙ্গবন্ধুকে স্বচক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো দেখলাম। প্রথম দেখেছিলাম আমাদের সরিষাবাড়ী রেলস্টেশনে। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যান্ডমাইকে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
এইচএসসির পর ১৯৭৫ সালে পাকাপাকিভাবে ঢাকায় আসি। তখন সামরিক শাসন চলছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। কবিতা লিখতাম। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হয়েছিলাম। বাবাকে একজন বোঝালেন, বাংলায় পড়লে ছেলে উচ্ছন্নে যাবে। বাবা সাফ জানালেন, বাংলায় পড়লে তিনি পড়াশোনার খরচ দেবেন না। পরে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। থাকি জহুরুল হক হলে। ক্লাস করি আর সুযোগ পেলেই বন্ধুরা মিলে ঢাকা শহর ঘুরে দেখি। লালবাগ কেল্লা, বাহাদুর শাহ পার্কসহ বইয়ে পড়া ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখতে যেতাম। বন্ধের দিন সকালে বের হই আর সন্ধ্যায় হলে ফিরি। পকেটে খুব বেশি পয়সা থাকত না। হেঁটেই আসা-যাওয়া করতাম।

ঢাকায় আমার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশ ম. হামিদের নাট্যচক্র দিয়ে। কিছুদিন পরই বুঝতে পারি, আমাকে দিয়ে নাটক হবে না। এত কসরত ভালো লাগত না। নাটক ছাড়ার আরো একটি কারণ, আমার এই চেহারা নিয়ে নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয়ের চান্স পাওয়ার কথা না! টেলিভিশন প্রথম দেখি ঢাকায় এসে। সাদাকালো টিভি। ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। জিয়াউর রহমানের আমলে প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিলে আমার মাথায় গুলিও লেগেছিল। স্বাধীনতার পরে প্রথম কোনো মিছিলে গুণ্ডারা গুলি করে। পরে ঠেলাগাড়িওয়ালারা আমাকে দ্রুত গাড়িতে তুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। রক্তে আমার গেঞ্জি-প্যান্ট ভিজে গিয়েছিল। পরে ছাত্রলীগের ছেলেরা আমাকে কাঁধে করে নিয়ে জগন্নাথ হলের ১১০ নম্বর কক্ষে রাখে। বিকালে আমাকে রিকশায় করে নিয়ে আসা হয় জহুরুল হক হলে। আমাকে দেখতে এসেছিলেন জননেতা আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ মোশাররফসহ অনেকেই। অনেক দিন পর সুস্থ হই।

রাতেও সারা শহর ঘুরে বেড়াতাম। তখন ঢাকা শহরে নিরাপত্তার কোনো অভাব ছিল না। সিনেমা দেখতাম বলাকা আর অভিসারে। মনে পড়ে সোফিয়া লরেনের ‘সানফ্লাওয়ার’ সিনেমা দেখেছিলাম অভিসারে। মধুমতিতে ইংরেজি সিনেমা দেখতাম। বিডিআরের সিনেমা হলে পুরনো দিনের সিনেমা দেখাত। মধুবালা ও অশোক কুমারের ‘মহল’ সিনেমা দেখেছিলাম সেখানে। তখন ঢাকা ছিল বেশ ফাঁকা। রাস্তাঘাট ছিল সরু। এত রাস্তা ছিল না, এত গাড়ি ছিল না। ফলে যানজট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রিকশাও কম ছিল। নিউ মার্কেটের রাস্তার দুই পাশে ছিল বটগাছ। জিয়াউর রহমানের আমলে বটগাছগুলো কাটতে শুরু করে। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছি।

এসএসসি ও এইচএসসিতে আমার ফার্স্ট ডিভিশন ছিল। এইচএসসি পরীক্ষায় পুরো জেলায় প্রথম বিভাগ পেয়েছিলাম আমরা তিনজন। বিশ্ববিদ্যালয়েও ফার্স্ট ক্লাস পেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ভাবনা আমার মধ্যে ঢুকে গেল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রথমে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি হয়নি। ১৯৮৩ সালে বিসিএস পাস করে জগন্নাথ কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। পিএইচডি করার পর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিয়মিত লেখালেখি করতাম। দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাকে কবিতা পাঠাতাম। কবি আহসান হাবীব ছিলেন দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক। শামসুর রাহমান তখন বিচিত্রার প্রধান সম্পাদক। আগে সম্পাদক ছিলেন, এরশাদের স্বৈরশাসনের সময় তাঁকে প্রধান সম্পাদক করা হয়। শামসুর রাহমান বলতেন, ‘দে কিক মি আপ’। তারা আমাকে লাথি দিয়ে ওপরে উঠিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আর কোনো ক্ষমতা নেই। ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন আল মুজাহিদী। তাঁদের অফিসে আড্ডা দিতে যেতাম। ১৯৮৩ সালে আমার প্রথম বই বের হয়, ‘একজন রাজনৈতিক নেতার ম্যানিফেস্টো’। বইটি প্রকাশের পরের বছরই দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। বইটি বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুবাদও হয়েছে। ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হলে ৩০ টাকা দিত। বিচিত্রার সম্মানী ছিল বেশি। লেখার বিল পেলেই বন্ধুরা মিলে খেতে যেতাম।

ঢাকা কলেজ, নিউ মার্কেট এলাকায় কোনো বিল্ডিং ছিল না। বাঁশ আর পলিথিনের ছাউনি দেওয়া টং দোকান ছিল। বিখ্যাত ছিল ভাই ভাই হোটেল। ১২ আনা বা ৭৫ পয়সায় চিংড়ি-পুঁইশাক দিয়ে ভাত খাওয়া যেত। ছোট মাছ নিলে আরো চার আনা বা ২৫ পয়সা বেশি লাগত। মুড়িঘণ্ট, মুরগি খেলে গুনতে হতো দেড় টাকা। ইটালিয়ান হোটেলেও খেতাম। ইট থেকে ইটালিয়ান। মানে ফুটপাতে ইট বিছানো থাকত, তার ওপর বসে খেত লোকজন। হলে তিনটি পরোটা চার আনা করে লাগত ১২ আনা, আর একটি সবজি ২৫ পয়সা। ডিম খেলে লাগত আরো চার আনা। দুপুরের খাবার খেতে লাগত দুই টাকা, রাতেও দুই টাকা। নিউ মার্কেট তখন অনেক সুন্দর ছিল। ঢাকা শহরের একমাত্র সাজানো-গোছানো মার্কেট ছিল এটি। বায়তুল মোকাররম, স্টেডিয়ামের একটি অংশ হলেও কিছু দোকান ছিল শুধু। নীলক্ষেত মার্কেট এলাকায় তখন ছিল বস্তি। এফ রহমান হলের উল্টোদিকে কয়েকটি লাল বাড়ি ছিল।

১৯৮৭ সালে ‘শৃঙ্খলমুক্তির জন্য কবিতা’ স্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করেছিলাম। এ বছর ৩১তম উৎসব হলো। এখন বিশ্বের বৃহত্তম কবিতা উৎসব। তখন এরশাদের সামরিক শাসন চলছে। কবিতা উৎসবে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক নেতারা কবিতা শুনতে এসেছেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দালন গতি পেয়েছে। একজন রিকশাওয়ালাও দুই লাইন কবিতা আবৃত্তি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এভাবে ঢাকায় নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটে গেছে অনেকটা দিন।

লন্ডন, রোম, ভেনিস, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, পেইচিং, টোকিও, দিল্লিসহ পৃথিবীর অনেক শহর দেখেছি। সব শহরই মোটামুটি পরিকল্পনামাফিক তৈরি হলেও ঢাকার কোনো কিছুই পরিকল্পনামাফিক হয়নি। প্রধান সমস্যা দুর্নীতি আর আইন না মানা। যে যেখানে ইচ্ছা বাড়ি বানিয়েছে। রাজউকে টাকা দিলেই প্ল্যান পাস হয়ে যায়। ত্রিপুরার মতো রাজ্যে একসময় আদিবাসী মেয়েরা টেবিল টেনিস খেলার ব্যাট দিয়ে ট্রাফিকের কাজ করত। আর আমাদের এখানে ট্রাফিক পুলিশকেও কেউ মানে না। হাজারীবাগের লেদার কারখানা সরিয়ে এখন যেখানে নিয়ে গেছে, সেখানেও দূষণ হচ্ছে। তাই শুধু সরিয়ে ফেললেই সমাধান হবে না, যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেও যাতে দূষণ না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়ে গেছে। বায়ুদূষণও ঢাকার একটি বড় সমস্যা। আমার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বেড়ে ওঠা—সব কিছু এই ঢাকাকে কেন্দ্র করে। শত নাগরিক সমস্যা থাকার পরেও ঢাকা আমার প্রিয় শহর।

গ্রন্থনা : আরাফাত শাহরিয়ার
ছবি : ইয়ামিন মজুমদার

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply