khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

জিয়ার নির্দেশেই বিমানবাহিনীতে অগণিত মুক্তিযোদ্ধা হত্যা

0 57

আনোয়ার কবির: ১ অক্টোবর, ১৯৭৭; ঢাকা, বাংলাদেশ॥ মধ্যরাতের পরপরই বিমানবাহিনীর বেশকিছু সংখ্যক নন-কমিশন্ড অফিসার এবং বিমানসেনা ক্যু এর প্রচেস্টা শুরু করলো উর্ধতন বিমান বাহিনী কর্মকর্তাদের এবং জেঃ জিয়া সরকারকে উৎখাতে। তাদের সাথে যোগ দিলো সেনাবাহিনীর একদল নন-কমিশন্ড অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং সাধারন সৈনিক। রেড আর্মির বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা তাদের কাজকে অনেকটাই সহজ করে দিলো।

এই অভ্যুত্থান পরিকল্পনাটি ছিলো সুপরিকল্পিত। প্রথমে পরিকল্পনা করা হয়েছিলো যে ৯ই অক্টোবর বিমানবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে অভ্যুত্থান করে জেঃ জিয়া সহ সকল উর্ধতন অফিসারকে হত্যা কিংবা আটক করা হবে। এরপর বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে সরকার পরিচালনার দ্বায়িত্ব নেয়া হবে। এসময় জেঃ জিয়ার হঠাৎ করেই ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে অপারগতা প্রকাশ করলে পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সাথে কিছুদিন আগেই জেঃ জিয়ার কায়রতে সাক্ষাত হয় যেখানে প্রেসিডেন্ট সাদাত জেঃ জিয়াকে কিছুদিনের মধ্যেই তাকে হত্যা করবার একটা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। জেঃ জিয়া বঙ্গবন্ধুর মত ভুল করলেন না। উনি সম্পুর্ন সতর্কতা অবলম্বন করা শুরু করলেন। তবে ২৮ তারিখের রেড আর্মির বিমান হাইজ্যাকের ঘটনা তাদের এই পরিকল্পনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারা পরিকল্পনা পিছিয়ে দেবার বদলে এই বিমান হাইজ্যাকের ঘটনায় সরকারের ব্যস্ততার সুযোগ গ্রহণ করে।

বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবন আক্রমণ করে এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বেতার কেন্দ্রের দখল নিতে সক্ষম হয়। তারা ঘোষণা করলেন যে, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র এবং জনতার সৈনিকদের বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছে এবং তাদের অভ্যুত্থান সফল হয়েছে।

তাদের মধ্যেই একদল বিদ্রোহী ঢাকা বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের নিয়ন্ত্রন নেবার চেষ্টা করেন যেখানে এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ এবং সরকারের অন্য সিনিয়র অফিসারেরা জাপানী হাইজ্যাকারদের সাথে দরকষাকষিতে ব্যস্ত ছিলেন। এখানেই সেনাদের বিদ্রোহ এক মারাত্মক মোড় নিলো। বিদ্রোহীরা তারা বিমান বাহিনী সহ সামরিক বাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের হত্যার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মাথা ছেটে ফেলতে চাইছিলো। আর একারনেই এ জি মাহমুদ বলেছিলেন,
– “যদি আমি বলি ওরা আমার লোক নয় তবে তুমি তাদের হত্যা করতে পারো।”

উনি প্রকৃতপক্ষে তার অফিসারদের বিদ্রোহীদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, জাপানীজ রেড আর্মিকে নয়।
ডানকে তার এই কথা শুনে সকল হিসেব নিকেশ ভুলে প্রথমবারের মত নির্লিপ্ত কন্ঠে জবাব দিয়েছিলেন,
– “আমি বুঝতে পেরেছি আপনাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা চলছে।”

বিমানের ভেতর থেকে জিম্মীরাও বিমানবন্দরের আশেপাশে চলতে থাকা নাটক দেখছিলেন এবং ছবি তুলছিলেন।

২ অক্টোবর, ১৯৭৭; ঢাকা, বাংলাদেশ॥ ভোরের দিকে একদল বিমানসেনা বিমানবন্দরের ডিজি সিভিল এভিয়েশনের অফিস কক্ষ থেকে এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরীকে নীচতলায় নামিয়ে নিয়ে আসলো অস্ত্রের মুখে। একজন সার্জেন্ট গুলি করলো গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসারকে লক্ষ্য করে। উনি সাথে সাথেই মারা গেলেন। সেই সার্জেন্ট আবার গুলী চালালো এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদকে লক্ষ্য করে, কিন্তু নিশানা লক্ষ্য ভেদ করলো না। এ জি মাহমুদ ছুটে পালালেন।

তবে অন্যান্য স্থানে লড়াই ছড়িয়ে পরলো। বিদ্রোহীরা বেশ অনেকজন বিমানবাহিনী অফিসারকে আটক করতে সক্ষম হলো এবং তাদের ১১ জনকে হত্যা করলো বিমানবন্দরেই। এদের মধ্যে ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাস মাসুদ, গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরী, উইং কমান্ডার আনোয়ার আলী শেখ, স্কোয়াড্রন লীডার আব্দুল মতিন প্রমুখ। গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাস মাসুদ এ জি মাহমুদের বোনের স্বামী ছিলেন। এ জি মাহমুদ সহ আরো অনেক সিনিয়র অফিসার পালিয়ে বাচতে সক্ষম হলেন। এরপর দিনভর খন্ডযুদ্ধের পর এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, এয়ার কমোডোর ওয়ালীউল্লাহ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমের নেতৃত্বে বিমানবাহিনীর অন্যান্য বিমানসেনারা সেনাবাহিনীর ৪৬তম ব্রিগেডের সহায়তায় বিদ্রোহীদের নিস্ক্রিয় করে ফেলতে সক্ষম হন।

এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ তার আত্মজীবনে তার বোনের স্বামী রাস মাসুদের হত্যাকান্ডের ঘটনার ব্যাপারে লিখেছেন, – “আমি আমার বোনের স্বামীকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হই। এটা আমার পরিবারেও উত্তেজনা এবং অসুখী আমেজ সৃস্টি করে, যা আজও বয়ে চলেছি।”

তবে বিদ্রোহীদের দমনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রাখলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর। বগুড়ার বিদ্রোহের পরপরই আরেকটি বিদ্রোহের আশংকা করছিলেন উনি নন-কমিশন্ড অফিসার এবং সাধারন সৈনিকদের পক্ষ থেকে। উনি সেই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত এবং অনুগত ছিলেন। উনি ঢাকার ৪৬ নং পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার লেঃ কর্নেল এম আমিনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীর নবম ডিভিশনের অপেক্ষা না করে সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে পৌছাতে যদি সেনাদের মধ্যে কোন ধরনের অসহিষ্ণুতা দেখতে পান। তার এই আগাম সতর্কতাই তাদের জীবনরক্ষা করলো।

যেহেতু ৪৬তম পদাতিক ব্রিগেড সম্পুর্ন সতর্ক অবস্থায় ছিলো, তাই তারা বিদ্রোহ শুরু হতে না হতেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রক্ষায় সক্ষম হয়। এ সময় বিদ্রোহীরা পিজিআর এবং পুলিশের প্রতিরক্ষা ভেঙ্গে প্রেসিডেন্টের ভবনে ঢুকে পরবার চেষ্টা করছিলো। নবম ডিভিশন আগে থেকেই সতর্ক থাকলেও দুরত্বের কারনে তারা যথাসময়ে পৌছাতে সক্ষম হয়নি। এই মধ্যবর্তী সময়ে ৪৬ ব্রিগেডের সেনারা বিদ্রোহীদের থামিয়ে রাখতে সক্ষম হলেন এবং সকালের দিকে নবম ডিভিশনের সেনারা তাদের সাহায্যের জন্য এসে পৌছান এবং খুব দ্রুতই বিদ্রোহ দমন করা হয়।

মেজর জেঃ মঞ্জুরের আগাম সতর্কতার কারনে এভাবেই ৪৬তম পদাতিক ব্রিগেডের লেঃ কর্নেল এম আমিন এবং তার অনুগত অফিসার ও সেনারা জেঃ জিয়ার সরকারকে একটা বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হলেন। যদি বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট এবং অন্য অফিসারদের হত্যা করতে সক্ষম হতো তবে সেটা জেঃ জিয়ার সরকারের অবসান ঘটাতো। হয়তো আরো অনেক সাধারন সৈনিক ও এনসিও তাদের সাথে যগ দিতেন যারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করছিলেন। এটাই ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহ যেটা দমন করতে বেশ বেগ পেতে হয় আগাম সতর্কতার পরেও। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সাথে এর মিল ছিলো, কারন বিদ্রোহীরা বিপ্লবী পরিষদ গঠনের মাধ্যমে দেশ চালনার ঘোষনা দিয়েছিলো। আর এই বিদ্রোহ ছিলো মারাত্মক, কারন এটা দেশের অন্য কোন স্থানে সংঘটিত হয়নি, হয়েছিলো ঢাকায় যাতে বিমান বাহিনী সহ সেনাবাহিনীর এনসিও এবং সৈনিকদের বড় একটা অংশ পরিকল্পিতভাবে অংশ নেয় এবং জেঃ জিয়া সহ সিনিয়র অফিসারদের হত্যার টার্গেট নিয়েই কার্যক্রম শুরু করে।

তবে সামরিক বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তাদের আনুগত্যের কারনে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান ভুমিকা পালন করলেন সিজিএস (চীফ অফ জেনারেল ষ্টাফ) মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং জেঃ জিয়ার সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

এই বিদ্রোহ দমনের পর জেঃ জিয়া টেলিভিশনে ভাষণ দিলেন। তবে এবার তার কন্ঠ কিছুটা বিচলিত শোনা গেলো। উনি নিজের বাসভবনের সামনে খন্ডযুদ্ধ হতে দেখেছেন যা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছেন। এরপর পরই তিনি প্রমানিত এবং সভাব্য সকল শত্রুর নির্মুলে নামবেন। উনি ভাবছেন, তাকে টিকে থাকতে হলে নির্ভেজাল সমর্থন এবং স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে। উনি ঘোষণা করলেন, যারা এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথে জড়িত ছিলো তাদের সমুলে উৎপাটন করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন রাজনৈতিক দল কিংবা পক্ষকে এ ব্যাপারে দোষী করে বক্তব্য দেয়া হলো না। তবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই জাসদ, মস্কোপন্থী কম্যুনিস্ট পার্টি, ডেমোক্রেটিক লীগ সহ আরো কয়েকটি দলকে ক্যুতে উস্কানী দেয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হলো। এসব দলের প্রধান নেতাদের গ্রেফতার করা হলো এবং এরপর দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে এসব দলকে কার্যত নিঃচিহ্নই করে দিতে সক্ষম হয় জেঃ জিয়ার সরকার। ধারনা করা হয় যে, প্রধানত পাকিস্তান প্রত্যাগত উর্ধতন সামরিক কর্মকর্তারা জেঃ জিয়াকে বলেন কঠোর পদক্ষেপ নিতে। তারা মত দিলেন যে, সেনাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করবার জন্য কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে। জেঃ জিয়া সম্ভবত সে মোতাবেকই কাজ করেছিলেন।

যদিও বিমানবন্দরের টারমাকে ১১ জন প্রান হারিয়েছিলেন, অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পর হাজার হাজার বিমানবাহিনী অফিসার এবং বিমানসেনাকে সেখানে এনে হাজির করা হয় এবং সামান্যতম সন্দেহের প্রমান পাওয়া গেলেই সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে কিংবা বিচার ছাড়াই তাদের হত্যা করা হয়।

এ ঘটনা বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নতুন করে পুনর্গঠিত হতে লম্বা সময় প্রয়োজন হয়l জেঃ জিয়ার অধীন সেনাবাহিনী এ সময় নির্মমতার অন্যরুপ প্রদর্শন করে। শত শত বিমানবাহিনীর সদস্যকে আটক করে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়। হাজারের বেশি বিমানবাহিনীর সদস্য, যাদের ক্যু তে জড়িত থাকবার অভিযোগে আটক করা হয়েছিলো তাদের আর কোনদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ নিজের চোখের সামনে তার সহকর্মীদের হত্যাকাণ্ড দেখে এবং পরবর্তীতে চোখের সামনে বিমান বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের বিচারের নামে গুম করা আর সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিলেন বিমানবাহিনী প্রধানের পদ থেকে সরে যাবার। উনি এ ব্যাপারে বলেছিলেন যে, উনি বুঝতে পারছিলেন নিজ বাহিনীর উপর উনার আর কোন কর্তৃত্ব ছিল না। পরবর্তীতে উনি জেঃ জিয়া কর্তৃক বিএনপি গঠিত হবার পরে তাতে যোগদানের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন।

বিচারের নামক প্রহসনের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বিমানবাহিনী সদস্যকে হত্যা করে লাশ গুম করিয়েছিলো জিয়াউর রহমান।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply