khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

৭ নভেম্বর : আজও বলি হচ্ছে বাংলাদেশ!

0 28

রুদ্র সাইফুল: আজ ৭ নভেম্বর বিএনপির নেতৃত্বে স্বাধীনতা বিরোধী চার দলীয় জোট জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করছে, ৭ নভেম্বরের ঘাতকচক্রের অন্যতম অংশীদার জাসদ পালন করছে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস; অথচ এই ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস। এই দিনটি পালন সম্পর্কে আমার সংশয় এবং বিভ্রান্তি কোনদিন কাটেনি। বিএনপি ও জাসদের এই দিবসটি পালনীয় শব্দগুলো বরাবরই আমার কাছে অবোধ্য, অন্তত ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষিতে। ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে ঘটা হত্যাযজ্ঞের মূল খলনায়ক কর্নেল আবু তাহের। মূল হত্যাকারী সংগঠন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), গণবাহিনী এবং তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা।

স্বাধীন বাঙলার ইতিহাসে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ডের পরে সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয় এই ৭ নভেম্বরে। ইতিহাসে এই দিনটি মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যার একটি কালো দিন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম, কে এন হুদা বীরউত্তম, এ টি এম হায়দার বীরবিক্রম ও নাজিয়া ওসমানের হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা কর্নেল আবু তাহের।১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে বিএনপি বলে কোনো দল জন্মগ্রহণ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তখনও নিষিদ্ধ। আজকের জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদ তখন পদোন্নতি পেয়ে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েছেন। আর ইসলামী ঐক্য জোটের শায়খুল হাদিসরাও তখন রাজনীতির অঙ্গনে ছিলেন না।

তাহলে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কি ঘটেছিলো? ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে জানার পূর্বে ঘুরে আসতে হবে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। সিআইএ ও আইএসআই-এর মদপুষ্ট হয়ে জিয়া ও তাহেরের নির্দেশে একদল সামরিক অফিসার আর সেনাবাহিনীর এক অংশবিশেষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে সকালে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির এক অফিসার কর্নেল তাহেরকে টেলিফোন করে বলে যে, মেজর রশীদের পক্ষ থেকে তিনি তাকে টেলিফোন করেন। তাকে বাংলাদেশ বেতার ভবনে যেতে বলে। সে টেলিফোনেই ওই অফিসার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ বিবরণ তাহেরকে বলে; টেলিফোনেই কর্নেল তাহের খুনীচক্রকে সাধুবাদ জানান। এটা পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান এই ঘটনার নেপথ্য নায়ক।

১৫ আগস্ট সকাল নটায় তাহের বেতার ভবনে উপস্থিত হন। মেজর রশীদ তাকে একটা কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তিনি খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মেজর ডালিম আর মেজর জেনারেল এম. খলিলুর রহমানকে দেখতে পান। খন্দকার মোশতাক সহ উপস্থিত খুনীচক্রের সঙ্গে তিনি কিছুক্ষণ রূদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেই সময়ে মেজর রশীদ তাকে আরেকটা কক্ষে নিয়ে গেলে তাহের মেজর রশীদকে অনুরোধ করেন যাতে জিয়া তাহেরকে মন্ত্রীসভায় জায়গা দেন। তাহের রশীদকে পরামর্শ দেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে অবস্থা পর্যালোচনা করে একটা শক্তিশালী মন্ত্রীসভা গঠন করতে। তাহের মেজর রশীদ আর লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিনকেই এই অবস্থা সামাল দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাহের মেজর রশীদকে আরও বলেন যে, অন্য কোনো বাহিনীর প্রধান কিংবা কোনো রাজনীতিবিদের উপর তার কোনো আস্থা নেই। তাহের আরও পরামর্শ দেন বাকশালকে বাদ দিয়ে অন্যসব রাজনৈতিক শক্তিকেও তথাকথিত ওই সামরিক সরকারের সম্মুখভাগে রাখতে হবে; যাতে আন্তর্জাতিক মহল মনে করেন যে বাংলাদেশে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়েছে।
তাহের খোন্দকার মোশতাকের সামনে বিবেচনার জন্য পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন:

১) অবিলম্বে সংবিধান স্থগিতকরণ
২) দেশব্যাপী সামরিক শাসন ঘোষণা ও তার প্রবর্তন
৩) দলমত নির্বিশেষে জাসদ ও ইসলামপন্থি সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তিদান
৪) বাকশালকে বাদ দিয়ে একটা সামরিক সরকার গঠন করা
৫) সামরিক বলয়ের জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটা লোক দেখানো জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

খোন্দকার মোশতাক কর্নেল আবু তাহের’র এসব কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। এইদিকে তাহের প্রিয় বন্ধু খুনী জিয়া মোশতাককে সতর্ক করে দেন যাতে তাহেরের কথা তিনি না মানে। তাই তো জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে খোন্দকার মোশতাক কর্নেল আবু তাহের’র সঙ্গে আলোচিত কথাগুলোর উল্লেখ করেনি। ঘাতক তাহের-জিয়ার হাত থেকে ক্ষমতা ফিরিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অন্যান্য কোরের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা; পুরো সেনাকমান্ড ভেঙে পড়তে পারে।

সশস্ত্রবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের কর্তব্য হচ্ছে সীমান্ত এবং প্রজাতন্ত্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নাক গলানো নয়। দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে তার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার মালিক হচ্ছে জনসাধারণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সশস্ত্রবাহিনীর অভ্যুত্থান ও পালটা অভ্যুত্থান, এর মূলে ছিলো খুনী তাহের-জিয়া গংয়ের ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব। তারা তাদের নিজ স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনি। আর তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তারা সাধারণ সৈন্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রিয়ার-অ্যাডমিরাল এম এইচ খান এবং এয়ার ভাইস-মার্শাল এম জি তাওয়াব খালেদ মোশারফকে মেজর জেনারেলের ব্যাজ পরিয়ে দেন। ৪ নভেম্বর বিকালে জিয়াউর রহমান তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কর্নেল আবু তাহের’র কাছে খবর পাঠান। জিয়াউর রহমান অনুরোধ করে তিনি যেন সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাকে মুক্ত করে খালেদ মোশাররফ গংকে হত্যা করে। তিনি জিয়াউর রহমানকে প্রতিশ্রুতি দেন খালেদ মোশাররফের অবসান ঘটানো হবে, হত্যা করা হবে খালেদ মোশাররফ’সহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের। এই মিশন নিয়েই কর্নেল আবু তাহের সৈন্যদের মধ্যে ব্যাপক যোগাযোগ, আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে ৭ নভেম্বর ভোর রাত, খালেদ মোশাররফদের হত্যার পক্রিয়া শুরু করা হবে। তাহেরের সিদ্ধান্তগুলো ছিলো:

১) খালেদ মোশাররফ চক্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে হত্যা করা
২) বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা
৩) তাহেরের নেতৃত্বে একটা সামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা
৪) ইসলামপন্থি ও জাসদের সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তিদান
৫) জাসদ ও গণবাহিনীর রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার
৬) বাকশালকে বাদ দিয়ে একটি সামরিক সরকার গঠন করা

তাহেরের পরিকল্পনা মাফিক বেতার, টেলিভিশন, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট-অফিস, বিমানবন্দর ও অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো প্রথম আঘাতেই দখল করে নেওয়া হয়। আর ভোর রাতে তাহেরের নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সদর দফতরে নিয়ে আসা হয়। তারপর বেতার থেকে মিশন কমপ্লিটের খবর প্রকাশ করে জিয়াউর রহমানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়, ফাঁকা ফায়ার করতে করতে তাহেরের জাসদ-গণবাহিনী ও সৈনিকরা ঢাকা শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। খোন্দকার মোশতাক ও বিচারপতি সায়েম জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে কর্নেল আবু তাহের’র সঙ্গে আলোচনায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই, ৮ নভেম্বর মেজর জলিল ও আসম আবদুর রবকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, মুক্তি দেওয়া হয় জামায়াতে ইসলামী কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে।

তাহেরের নির্দেশে জাসদের গণবাহিনী ও জিয়ার সৈনিকেরা নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম’কে, কে এন হুদা বীরউত্তম’কে, এ টি এম হায়দার বীরবিক্রম’কে ও কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরীকে বাসায় না পেয়ে তাঁর স্ত্রী নাজিয়া ওসমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে তাহেরের গণবাহিনী।

পাপ বাপকেও ছাড়ে না, তাই তো জিয়াউর রহমান তার প্রাণরক্ষার জন্য কর্নেল তাহের’র নিকট দূত পাঠিয়ে ছিলেন; কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার পর কর্নেল তাহের’র প্রাণদণ্ডের আয়োজন করেন, তা খুবই স্বাভাবিক। ৭ নভেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জিয়াউর রহমান ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করলেও ১২ নভেম্বর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। জিয়াউর রহমান তাকে এড়িয়ে যান। ১৩ নভেম্বর, পুলিশের একটা বড় দল কর্নেল আবু তাহের’র ভাই আনোয়ার হোসেন, মেজর জলিল ও আসম আব্দুর রবসহ অনেক জাসদ নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিয়ে আসে। এই ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল আবু তাহের জিয়াউর রহমানকে টেলিফোন করেন, কিন্তু অন্যপ্রান্ত থেকে জানানো হয় তিনি নেই; বরং তার পরিবর্তে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এরশাদ কথা বলে জানান যে, এই ব্যাপারে সেনাবাহিনী কিছুই জানে না, এটা হচ্ছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ পুলিশী তৎপরতা। নিজের পাপে ফেঁসে যান তাহের, যাকে ৭ নভেম্বর ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন তাহের সেই জিয়াই আবার এক নতুন ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে উঠে।

২৪ নভেম্বর এক বিরাট পুলিশ বাহিনী কর্নেল তাহেরকে ঘিরে ফেলে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার জানায় যে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের সঙ্গে যাওয়া দরকার। তারপর তাকে একটি জিপে তুলে সোজা জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবেই নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পা দিলেন কর্নেল তাহের। তাহের-জিয়া খুনীচক্রের ৭ নভেম্বরের সেই ষড়যন্ত্রের বলি আজকেও হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

সাংবাদিক, ঢাকা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply