khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটির শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত

0 257

“অর্ঘ্য ভরিয়া আনি ধরো গো পূজার থালি,
রতনপ্রদীপখানি যতনে আনো গো জ্বালি,
ভরি পেয়ে দুই পানি বহি আনো ফুলডালি,
মার আহ্বানবানী রটাও ভুবনমাঝে” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

লোটাস রায়: শরৎকাল, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলগুলো যেন বাতাসের সাথে দুলছে, আকাশে বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপে আশ্বিন মাসে চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে রূপান্তরিত করার শুভলগ্নে সূচনা হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের। আনন্দঘন পরিবেশে ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে সকল মানুষের সম্মিলনী ও সার্বজনীন পূজার যে অনন্য দৃষ্টান্ত অত্র এলাকার “গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটি” স্থাপন করেছে, তারই ধারাবাহিকতায় ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭, “মার্ক টোইন মিডল স্কুল” মিলনায়তনে পঞ্চমবারের মত আয়োজন করেছিল সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবের। এ আয়োজন ছিল প্রবাসের মাটিতে স্বত্তীয় আমেজপূর্ন মা মঙ্গলময়ীর প্রতি আরাধনা।

দুর্গ্তিনাশিনী মা দুর্গার পূজা অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ গ্রহন, সন্ধ্যা আরতি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা দিয়ে সাজানো হয়েছিল সারাদিনব্যাপি এই সার্বজনীন দুর্গোৎসবকে। পূজার পৌরহিত্য করেন মহাদেব ঘটক। পিতৃপক্ষের শেষ, দেবীপক্ষের শুরুর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের পূন্যলগ্নের সূচনা হয়। বছরঘুরে দেবী দুর্গা পা রাখেন মর্তলোকে। পুরানমতে, অশুভ অসুরশক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হওয়ার পর চারিদিকে শুরু হয় অশুভ শক্তির প্রতাপ। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্রিত হন দেবতারা। তখন দেবতাদের তেজরশ্মী থেকে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী মা দেবী দুর্গা। প্রতিষ্ঠা পায় শুভ শক্তি।

এই শুভ শক্তির আলোয় আলোকিত হোক, বিশ্বের সকল কিছু। প্রতিষ্ঠা পাক বৈষম্যহীনতা। এই বানী নিয়ে শারদীয়া মা মহামায়ার প্রতি শ্রদ্ধা দিতে ভক্তবৃন্দ যেন ভক্তিভরে অন্তরের অন্তস্থল থেকে পুষ্পাঞ্জলী অর্পন করেন মায়ের চরনে। পুরো পূজো আঙ্গিনায় যেন বেজে উঠে ঢাক, ঢোল আর কাশির বাদ্য। চারিদিকে ধুপ ধুনার গন্ধ। ভক্তবৃন্দের পূজার ঢালিতে ঢালিতে ভরে যায় মায়ের পূজাঞ্জন। পঞ্চদীপের আলোকশিখায় ঘুচে যাক সকল অন্ধকার। সকল ভক্তের কন্ঠে উচ্চারিত হয়- “যা দেবী সর্বভূতেষু, শক্তি রূপেনু সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্ত্যস্যৈ নমস্তস্যৈ নমোঃ নমঃ”। পূজা অর্চনা শেষে কয়েক পর্বে অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ গ্রহন, মধ্যাহ্নভোজ ও সান্ধ্যভোজের আয়োজন করা হয়।

শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা ও তার বিকাশ, প্রবাসে বেড়ে ওঠা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সাথে পরিচয় করবার মূলমন্ত্রে আয়োজন করেছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালার। শ্লোক পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এরপরই ক্ষুদে কচি কাঁচারা নৃত্যের তালে তালে আহ্বান করে মা দুর্গাকে। বর্নিল সাজে সেজে উঠে কচকাচারা। তাদের অনবদ্য পরিবেশনায় ছিল ছড়া, গান, নৃত্য। এছাড়াও ক্ষুদে শিল্পীদের পরিবেশনায় ছিল গীতিনাট্য “নারী জাগরনে দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা” গীতিনাট্যে তারা উপস্থাপন করে বর্তমান নারীর অবস্থানকে। এছাড়াও বড়দের অনবদ্য পরিবেশনায় ছিল মা দুর্গার আগমনী সংগীত, একক ও দ্বৈত কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক ও ফোক। নুপূরের ঝঙ্কারে বেজে উঠে নৃত্যাঙ্গন। শারদীয়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতে ফিউসন উপস্থাপনা সমগ্র পূজা পরিক্রমায় একটি আলাদা মাত্রা এনে দেয়। যা ছিল প্রবাসের মাটিতে দেশের পূজার রূপ, রস ও গন্ধ। এছাড়া অত্র এলাকার শিল্পি সুকান্ত বড়ুয়ার অসাধারন গায়কী উপস্থিত সকল দর্শক শ্রোতাকে বিমোহিত করে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আরেকটি পর্বের অন্যতম আকর্ষন ছিল ভারতের লগ্নজিতা চক্রবর্তী ও গৌরব সরকারের গাওয়া গান। তাদের অনবদ্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শককে শুধু মুগ্ধই করেনি, এনে দেয় সমগ্র পূজায় আরেকটি আলাদা মাত্রা। দর্শক শ্রোতা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে সময় শেষ হলেও তাদের শেষ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না এই মিলনমেলার।

সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাটিকে আরো আকর্ষিত করবার লক্ষ্যে পুরো সময়টা জুড়ে যন্ত্রানুসঙ্গে সংগত করেছেনঃ তবলায়- আশীষ বড়ুয়া, হারমোনিয়ামে সীমা দাশ ও মন্দিরাতে জয় দত্ত বড়ুয়া। সাংস্কৃতিক পরিবেশনাকে আরও আকর্ষনীয় করার পিছনে একটি মঞ্চসজ্জার ভূমিকা অপরিসীম। গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটির সাংস্কৃতিক মঞ্চসজ্জা ছিল সকল মানুষ ও ধর্মের মেলবন্ধনের প্রতীকস্বরূপ। এই মঞ্চসজ্জাটির ক্ষেত্রে যার মেধা ও মনন কাজ করেছে তিনি হলেন আমাদের অতিপরিচিত তাপস ইন্দুদা।

সাবলীল সঞ্চালনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বটিকে পরিচালনা করেন সরোজ শর্মা ও লোটাস রয়।
পঞ্চপ্রদীপের আলোক শিখা ও সন্ধ্যাআরতির মাঙ্গলিক ছায়ায় বিনাশ হোক অশুভ অসুর শক্তি, প্রতিষ্ঠা পাক নির্মল ও সুন্দরের। ধর্ম-বর্ন-নির্বিশেষে সাংস্কৃতিক ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গের সম্মিলনে “গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটি”র আনন্দঘন মনোরম পরিবেশে পূজার এই বর্নিল আয়োজন সত্যিই যেন রূপ নেয় সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল মন্ত্রে, বিকাশ লাভ করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply