khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র

0 40

ড. মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী : মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরেই রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং এ ঘটনাগুলো দেশে ও বিদেশে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু এবার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তিন লক্ষাধিক শরণার্থী। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এই আগমন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এ বিষয়ে কিছু আলোকপাতের জন্যই এ লেখা।

রাষ্ট্র তৈরি হয় একটি ভূখণ্ড, জনগণ আর তার পরিচালনার জন্য সরকার নিয়ে। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটকে একটি রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে দেখা এবং এ নিয়ে সরকার আর জনগণের একসঙ্গে কাজ করা দরকার। বলে রাখা প্রয়োজন যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত সরকার আর বাংলাদেশের জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিন-চার লাখ মানুষকে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে আশ্রয় দেয়া এবং তাদের জন্য খাবার, পোশাকের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখানে মানবিকতাকে সবচেয়ে উপরে স্থান দিয়েছে এবং এজন্য অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশ বহু ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। এজন্যই আমি লেখাটির শিরোনামে শরণার্থী শব্দটির পরিবর্তে সংকট শব্দটি ব্যবহার করেছি।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত আছে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী ও বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা এবং সাধারণ মানুষ। হিটলারের ইহুদি নিপীড়ন যেমন তত্কালীন জার্মানির মানুষের সমর্থন নিয়েই ঘটেছিল, তেমনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিপীড়নও ঘটছে দেশটির সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়েই। যারা ব্যক্তিগতভাবে মিয়ানমারের নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তারা সবাই জানেন যে, মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ রোহিঙ্গাদের প্রতি প্রবল বিদ্বেষ পোষণ করে। রোহিঙ্গাদের কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় নেই। মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, অথচ তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেখানে বাস করে আসছে। তাদের পরিচয় অস্বীকার করার জন্য রোহিঙ্গাদের বলা হয় বাঙালি, যেন তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আমার জানামতে, পুরা মিয়ানমার এ মিথ্যাচার আর বিদ্বেষের মধ্যে ডুবে আছে। এই জাতিগত বিদ্বেষে আরো ইন্ধন জোগাচ্ছেন কিছু বৌদ্ধ ধর্মগুরু, যার ফল মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের এ প্রচেষ্টা। জাতিগত বিদ্বেষ মানবেতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। জাতিগত বিদ্বেষ থেকে মাঝে মাঝে কোনো কোনো জাতিকে নির্মূলের ঘটনাও ঘটেছে। যেমন তুরস্ক থেকে নির্মূল করা হয়েছিল আর্মেনীয় খ্রিস্টানদের। তবে আধুনিক বিশ্বে এ ধরনের ঘটনাকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না এবং অত্যন্ত নিন্দনীয় মনে করা হয়।

রাষ্ট্রহীন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর যা ঘটার, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে। অনেকে বলে থাকেন যে, তারা অপরাধী জাতি— চুরিসহ অন্যান্য অপরাধ তাদের স্বভাবজাত— তারা কোনো নিয়ম মানতে চায় না। ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার রাষ্ট্রের স্বীকৃতিহীন একটা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তো তা ঘটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মধ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবণতাও দেখা দিয়েছে। অনেকে বলে থাকেন যে, রোহিঙ্গারা অত্যন্ত কট্টর, উগ্রবাদী ধর্মবিশ্বাস লালনপালন করে। যে জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল জনগোষ্ঠী দ্বারা নানাভাবে নিপীড়িত আর বঞ্চিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটা তো অস্বাভাবিক নয়।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে শেষ কথা হলো, তারা নিপীড়িত ও রাষ্ট্রহীন। রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে মানবিক আচরণ করছে, তা আরো দীর্ঘসময় ধরে করে যেতে হতে পারে এবং এ বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। বাংলাদেশ যে তা করবে, তাতে আমার কোনো সংশয় নেই। আশঙ্কা হলো, বাংলাদেশের ভেতর থেকে কিছু উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সমস্যাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে। ফেসবুক, ইউটিউব আর সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা বিভিন্ন ছবি, ভিডিওর নিচের মন্তব্যগুলো পড়লেই এ আশঙ্কাকে আর ভিত্তিহীন মনে হবে না। আপাতত এগুলো মন্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কিন্তু আমাদের তাই সতর্ক ও সংযত থাকা দরকার, যাতে নিপীড়ককে প্রতিহত করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হই।

অনেকে আশঙ্কা করছেন যে, রোহিঙ্গাদের ওপর সাম্প্রতিক এ নিপীড়ন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। এ আশঙ্কা অমূলক নয়। তেল ও গ্যাসের জন্য মিয়ানমারের ওপর অনেক দেশেরই নজর আছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে কোনো কোনো মুসলিম দেশের প্রতিক্রিয়া বিস্ময়কর। নির্যাতিত রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে তারা বিচলিত অথচ তারা নিজের দেশে ক্রমাগত মুসলমানদের নির্যাতন করে যাচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো, এদের প্রতি বাংলাদেশের কিছু মানুষের মুগ্ধতা। এ দলে আমার কিছু ফেসবুক ফ্রেন্ডও আছেন। এ ফ্রেন্ডদের বলছি, মনে রাখবেন, বাংলাদেশ বিপদে পড়লে এসব দেশ ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত খুশি হবে। এখানে আরো লক্ষ করার বিষয় যে, রোহিঙ্গারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে না গিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র আন্দোলনের সফলতার কোনো উদাহরণ নেই। মনে করা তাই স্বাভাবিক যে, সাম্প্রতিক ঘটনাটা কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ।

অনেকে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন। বাংলাদেশের অনেকেই মিয়ানমারকে সামরিকভাবে শায়েস্তা করার কথাও বলছেন। এই দলে উগ্রবাদী ছাড়াও আছেন কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। সত্যিই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি, ভিডিও দেখলে মাথা গরম হয়ে যায়। তবু তাদের বলব, মাথা ঠাণ্ডা করুন। সিরিয়ার ২০-৩০ লাখ শরণার্থী এখন জর্ডান আর লেবাননে বাস করছে। এ দেশগুলো শত কষ্টের মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে। আমাদেরও আপাতত তা-ই করতে হবে।

যুদ্ধের একটা আশঙ্কা আছে। মিয়ানমারের মানুষের মধ্যে যেভাবে উগ্রতা দানা বাঁধছে, তার ফলে যেকোনো সময়ে মিয়ানমারই বাংলাদেশ আক্রমণ করে বসতে পারে। তাই বাংলাদেশকে সামরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ সামরিক শক্তিতে অন্তত কাগজ-কলমে মিয়ানমারের থেকে পিছিয়ে। বিশেষ করে বিমানশক্তিতে। বর্তমান সরকার জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু তার ফল পেতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এ নিয়ে রাষ্ট্রের সবার এক থাকা দরকার। ঐক্যের অভাব বাংলাদেশের সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকার একটা কারণ। মনে রাখতে হবে যে, আগের একটি সরকার বাংলাদেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধজাহাজকে শুধু রাজনৈতিক কারণে বছরের পর বছর নন-কমিশন্ড অবস্থায় ফেলে রেখেছিল। মিগ-২৯ কেনার কারণে সবার বিপক্ষে দিয়েছিল মামলা। এসব আত্মঘাতী আচরণ পরিহার করা জরুরি।

মূল কথা হলো, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন বাংলাদেশকে একটা অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। খুব সহজেই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। এ সময় তাই বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, কেউ পাঁচ-ছয় বছর আগেও সিরিয়া-লিবিয়ার অবস্থা এ রকম হবে ভাবতে পারেনি। বাংলাদেশেরও হতে পারে হঠাৎ করে এ রকম পরিণতি। যেকোনো বিপদ থেকে অনেক বড় বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই দরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্থাৎ সরকার আর জনগণের ঐক্যবদ্ধ থাকা।

লেখক: যুক্তরাজ্যের বোর্নমাউথ ইউনিভার্সিটিতে অর্থশাস্ত্রের শিক্ষক

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply