khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

‘আমরা জনগণ’ হিমালয়স্পর্শী ‘আমি’তে বিলীন হয়েছিল প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণেই আমিত্বের ছাপ

0 128

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ । ছবি: সাজিদ হোসেন

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায়: তোফায়েল আহমেদের সাক্ষাৎকার

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা, বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে গত শনিবার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোর মুখোমুখি হন। তাঁর বাসভবনে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

সাক্ষাৎকারটি খবর ডটকমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

প্রথম আলো: রায়ে ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’ বিতর্কে অনেকের মতে বঙ্গবন্ধুকে আদৌ ইঙ্গিত করা হয়নি। আপনি কীভাবে দেখেন?

তোফায়েল আহমেদ: এ বিষয়টি আদৌ রায়ের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল না। অহেতুক ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’ নিয়ে একটা বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন ড. কামাল হোসেন আপনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেই বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সই করা সংবিধান ‘আমরা’ দিয়ে শুরু হয়েছে। সেটা তো আছেই, কিন্তু তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, বঙ্গবন্ধু ‘আমি’ দিয়েই তাঁর স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর সাতই মার্চের ভাষণে, ‘আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি, আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না’র মতো অনেক বাক্য রয়েছে।

প্রথম আলো: কিন্তু রায়ে এই ‘আমি’কে খাটো করা হয়নি। বরং আমাদের মনে হচ্ছে, বিএনপি একটা অসূয়াপ্রসূত প্রতিক্রিয়া দেখানোয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন আপনারা।

তোফায়েল আহমেদ: আমি আপনার সঙ্গে দ্বিমত করব। তার কারণ, রায়ে যেভাবে ‘আমিত্ব’ ও ‘আমরাত্ব’কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেখানে কিন্তু ওই যে ‘আমি’কে আমি যেভাবে চিত্রিত করেছি, তার প্রতিফলন নেই।

প্রথম আলো: মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড শেখ মুজিবের আলোচনার নথি লিপিকার লিখেছিলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ‘আমার পানি’, ‘আমার মাটি’ ইত্যাদি বলেছেন।

তোফায়েল আহমেদ: হোয়াইট হাউসে আমি তো সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ওই বৈঠকের ‘আমি’র ব্যবহার লক্ষ করুন। ফোর্ডকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে। আমি আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা চাই।’ তখন ফোর্ড একটি শর্ত আরোপ করার মতো প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, ‘দুঃখিত মি. প্রেসিডেন্ট, শর্ত মেনে আমি আমার জনগণের জন্য কোনো সাহায্য নেব না। সত্তরের নির্বাচনে কী বলেছেন?’

প্রথম আলো: সংবিধানের প্রস্তাবনায় কিন্তু।

তোফায়েল আহমেদ: শেষ করতে দিন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি আপনাদের জন্য জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করতে পারি, অামি যদি বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি, আমি যদি আমার জীবন-যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, আমি কি আপনাদের কাছে ভোট চাইতে পারি না?’ সুতরাং এই ভোটটা ‘আমি’কে দেওয়া
 হয়েছিল। আর সেই ‘আমি’ আমাদের জন্য স্বাধীনতা ও সংবিধান এনেছিলেন।

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ঠিকই বারবার ‘আমরা’ কথাটি আছে, কিন্তু সেই ‘আমরাত্ব’র ভিত্তি কী, সেটা আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। ‘আমরা’ অর্থাৎ জনগণ থেকেই ‘আমি’ এসেছে, কিন্তু একটি পর্যায়ে এসে ‘আমরা জনগণ’ এক হিমালয়স্পর্শী ‘আমি’তে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। একটিমাত্র বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের কণ্ঠ। আমাদের সংবিধান ছাব্বিশে মার্চের প্রথম প্রহরের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ওপর দাঁড়ানো। সেখানে কী আছে? স্বাধীনতার ঘোষণার প্রথম বাক্যটাই শুরু এভাবে, ‘ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা।’…‘আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে…।’ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া খান শুধু বঙ্গবন্ধুকেই বিশ্বাসঘাতক এবং বিনা শাস্তিতে এবারে আর তাঁকে যেতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। সুতরাং রায় সমালোচনার যোগ্য এই কারণে যে সেখানে এই ‘আমি’কে খাটো করার ইঙ্গিত আছে। আরও দুঃখ লাগে, ড. কামাল হোসেন যখন ‘আমরা জনগণ’ বলে খণ্ডিত বক্তব্য দেন, সংবিধানেই যে ‘আমি’র স্বীকৃতি আছে, তার উল্লেখ করতে তাঁর স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। আর এর ফলে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত প্রতিপক্ষরা তৃপ্তি বোধ করেন।

প্রথম আলো: কিন্তু রায়ে বঙ্গবন্ধুকে বারবার জাতির জনক বলা হয়েছে। তাতে আপনি যেভাবে ‘আমি’কে চিত্রিত করেছেন, তা স্বীকৃতি লাভ করেছে। ‘আমিত্ব’ চলতি নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। বলছিলাম, বিএনপির প্রতিক্রিয়া।

তোফায়েল আহমেদ: ১ তারিখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ কোনো কথা বলেনি। ৯ তারিখ পর্যন্ত আমরা কোনো প্রতিক্রিয়া দিইনি। যদিও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী এবং ব্যানানা রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়েছে এবং তা ঠিকই আছে। কিন্তু বিএনপি এত উৎফুল্ল কেন? বিএনপি বলতে শুরু করল, লজ্জা থাকলে আওয়ামী লীগের পদত্যাগ করা উচিত। অবশ্য এটা তাদের জন্যই খাটে। লজ্জা থাকলে জিয়ার তথাকথিত আদর্শ ছেড়ে তাদেরই পদত্যাগ করা উচিত। এই রায় নিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের যে কথাবার্তা, সেসব মিলিয়ে আমরা কথা বলতে বাধ্য হয়েছি। বিএনপির প্রতিক্রিয়া আমাকে অবাক করেছে। আমরা অপেক্ষা করেছিলাম জাতীয় সংসদের জন্য। সংসদেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চেয়েছিলাম। অতীতে আমরা কখনোই কোনো প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ বা রায় নিয়ে এতটা বিতর্ক হতে দেখিনি। পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পরও এমনটা দেখা যায়নি। প্রধান বিচারপতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি, কোনো প্রধান বিচারপতি আজ পর্যন্ত এত বেশি কথা বলেননি। সেদিন তিনি বলেছেন, ‘আমাকে মিসকোট করা হয়েছে।’ মিডিয়াকে অনুরোধ করেছেন, যাতে মিসকোটের ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মিসকোটের সুযোগ মিডিয়া কীভাবে পেল? কথা যদি বেশি বলা না হতো, তাহলে? কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা স্পষ্ট করে না বললেই মিসকোটের আশঙ্কা তৈরি হয়। আমি জানি না, মিডিয়া মিসকোট করেছে কি না। তবে সেটা ঘটে থাকলে মিডিয়াকে কতটা দোষ দেওয়া যায় আর অস্পষ্টতা বা অপ্রাসঙ্গিকতা কতটা দায়ী, সেটাও একটা বিবেচনার বিষয়।

প্রথম আলো: ওই দিনই আদালত থেকে বেরিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে বলেছিলেন, মিডিয়া তাঁকে মিসকোট করেছে। প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের পরও যে প্রতিক্রিয়া হয়নি, তার থেকে বেশি বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। এখন যেভাবে হুমকির কথা বলা হচ্ছে, সেভাবে বলেননি।

তোফায়েল আহমেদ: না, হুমকি নয়। অ্যাটর্নি জেনারেল যেটা আপনাকে বলেছেন, এটাই তো বাস্তব কথা। তিনি যদি বলেই থাকেন প্রতিক্রিয়া হয়নি, সেটা বলাই তো অসমীচীন। কারণ, পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পেছনে সামরিক বন্দুক রাখা। আবার প্রতিক্রিয়া হয়নি, মানে কী। নওয়াজ শরিফ বলেছেন, রায়ের কারণে একাত্তরের মতো পাকিস্তান আবার ভেঙে যাবে। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরিফের ছেলেমেয়েদের নাম এসেছে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যে তদন্ত হয়েছে, তাতে বিচারকেরা আইএসআই ও এমআইর (মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) দুজন কর্মকর্তাকে রেখেছেন। এখন অবস্থাটা বুঝুন। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশের সুপ্রিম কোর্ট কি ভাবতে পারেন, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিতে বিচারকেরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দুজন কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। আমি তো বলব, এটা সমগ্র বিশ্বের বিচার বিভাগের জন্য একটি লজ্জা। সুতরাং যদি কোনো উদাহরণ দিতে হয়, তাহলে পাকিস্তানের নাম নিতে হবে কেন? পাকিস্তানের মানবাধিকারনেত্রী আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন, পাকিস্তানের দুটি জায়গার বিচার হয় না—একটি সেনাবাহিনী, অন্যটি সুপ্রিম কোর্ট। অথচ পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আজ পর্যন্ত তাঁদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

প্রথম আলো: কিন্তু এটাও সত্য, আদালত রেফারেন্সের ভিত্তিতেই চলে। যেমন পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতি খায়রুল হক শতাধিকবার পাকিস্তান শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ: সেটা কোনো উপযুক্ত প্রসঙ্গে হতে পারে। যেমন আমরা বলি, শুধু পাকিস্তানেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রয়েছে।

প্রথম আলো: শুধুই পাকিস্তানে, তা নয়। আরও অনেক দেশে রয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ: তা রয়েছে। কিন্তু বড় দেশে নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কোনো বড় দেশেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই।

প্রথম আলো: আমরা তর্কটা একটা ত্রুটিপূর্ণ জায়গা থেকে করছি। কারণ, অপসারণপ্রক্রিয়ার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত কীভাবে হবে? ভারতেও সংসদীয় ভোটাভুটিতে অপসারণ প্রস্তাবের ভাগ্য চূড়ান্ত হলেও যে তদন্ত হয়, তার তিন সদস্যের কমিটির দুজনই সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত বিচারক।

তোফায়েল আহমেদ: সে রকমের একটা জায়গায় তো আমরা যেতে পারতাম। কিন্তু আমরা তো সে সুযোগ পেলাম না। তদন্ত কমিটির একটা খসড়া তৈরির মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা হলো। তদ‌ন্তের আইন না হওয়ার কারণে ষোড়শ সংশোধনী তো পূর্ণতাই পায়নি। সুতরাং যে শিশুটি এক অর্থে মাতৃজঠরে রয়ে গেছে, সে পৃথিবীতে এসে ভালো কি মন্দ করবে, তার একটা বিচার হয়ে গেল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাজটা কী? তার একমাত্র কাজ কিন্তু তদন্ত করা। অপসারণ করার এখতিয়ার সংবিধান তাদের দেয়নি, এটা নির্বাহী বিভাগের হাতেই তাদের রাখতে হলো।

প্রথম আলো: প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ব্যতিরেকে তাঁরা কারও আচরণ তদন্ত করতেও স্বাধীন নন, আবার সেখানে সংসদের একজন সদস্যের (প্রধানমন্ত্রী) সিদ্ধান্তকে তাঁরা আস্থায় নিলেন, আর ৩০০ জনের ওপর অনাস্থা ব্যক্ত করলেন। তাঁরা বললেন, এতেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত থাকবে। আপনি কীভাবে দেখছেন?

তোফায়েল আহমেদ: আপনি একটি সুন্দর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। এখন সংর‌ক্ষিত আসন নিয়ে ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। যদিও মহিলা আসন সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য রয়েছে।

প্রথম আলো: এখানেও একটা মিসকোট দেখি, রায়ে আছে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সংর‌ক্ষিত আসনের সদস্যরা বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়ায় ভোট দেন না। অথচ বলা হচ্ছে, নারীদের অবজ্ঞা করা হয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ: আসলে এটি একটি ব্যবস্থার অংশ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও কিন্তু পরোক্ষ ভোটে মহিলা এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন আপনি যদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে মান কিংবা যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কিন্তু আমরাও ভিন্ন যুক্তি দিতে পারি। তাঁরা একটি উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত ৩০০ সদস্যের দ্বারা নির্বাচিত। আমাদের বিচারকেরা রাষ্ট্রপতির দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত। জাপানের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে প্রধান বিচারপতির নির্বাচন এখন বাংলাদেশে চালু করা যায় কি না, তা মনে হচ্ছে ভাবনার বিষয়। এখন মূল বিষয় হলো, একজন প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়। এখন তিনি আবার ১১৬ অনুচ্ছেদের দিকেও নজর দিচ্ছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ । ছবি: সাজিদ হোসেন

প্রথম আলো: এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থানে একটি ভয়ানক অসংগতি রয়েছে। বিচারক অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে আপনারা মূল সংবিধানে ফিরতে চেয়েছেন। আবার প্রধান বিচারপতি যখন ১১৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে মূল সংবিধানে ফিরতে চাইছেন, তখন আপনারা এর বিরোধিতা করছেন। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পরিহাস কি না?

তোফায়েল আহমেদ: প্রধান বিচারপতি যেভাবে সংসদকে ছোট করতে চেয়েছেন, তাকে অপরিপক্ব ও অকার্যকর হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, সেটা তো জনমনে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ ক্ষমতার মালিক, সেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি আমরা। সুতরাং আপনি যা-ই বলুন, সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা বিশ্বের প্রায় সব উন্নত গণতন্ত্রে দেখা যায়।

প্রথম আলো: শ্রীলঙ্কায় প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ বিশ্বে নিন্দা কুড়িয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ: তা হোক। আবার আমরা তো এটাও দেখি, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কা‌উন্সিল কোথায় আছে, তার সপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে লেসেথোর মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উদাহরণ দেওয়া হয়। যেসব দেশের জনসংখ্যা দুই-এক লাখ। সেসব দেশের উদাহরণ হাজির করতেও আপনাদের বাধে না। আবার শ্রীলঙ্কার কথা বললে তার গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এটা তো একটা স্ববিরোধিতা। আমি প্রধান বিচারপতির প্রতি বিনয়ের সঙ্গে একটা কথা বলব, সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারক সম্পর্কে তিনি কী করে চিঠি দিলেন যে দুদক তাঁর দুর্নীতির প্রমাণ পেলে তিনি যে রায় দিয়ে গেছেন, সেই রায়গুলো বিতর্কিত হবে।

প্রথম আলো: একটা যুক্তি হয়তো এই হতে পারে, আলোচ্য বিচারকের ক্ষেত্রে ওই চিঠি অগ্রহণযোগ্য হলেও ভবিষ্যতে নির্বাহী বিভাগ কোনো স্বাধীন বিচারকের রায়ে ক্ষুব্ধ হওয়ার বশবর্তী হয়ে অবসরকালীন জীবনে হয়রানি করতে পারেন।

তোফায়েল আহমেদ: না, এর সঙ্গে আমি একমত নই। দুদক একজন কর্মরত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে। পাকিস্তানেও তো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। তাহলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত না করা কোনো যুক্তি হতে পারে না।

প্রথম আলো: কিন্তু তিন-চার মাস পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর অবস্থান বদলেছেন। দুদক যে তথ্য চেয়েছে, সেটা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং পুনর্বিবেচনার বিষয়টি আপনাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।

তোফায়েল আহমেদ: সেটা আমার জানা নেই। তবে সেই চিঠি দেওয়া ভুল হলে তা কি প্রত্যাহার করা হয়েছে? আমি সেই চিঠির ভিত্তিতেই মন্তব্য করছি। এ কথার যুক্তি কী যে দুর্নীতির তদন্ত হলে তার রায় বিতর্কিত হবে? তাহলে কোনো কর্মরত বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে না? আর উঠলে, আর তদন্ত হলেই কি তাঁর দেওয়া রায়গুলো বিতর্কিত হবে? তার মানেটা দাঁড়াল, বিচারক হলেই হলো, তিনি কর্মরত থাকুন আর অবসরে যান, তাঁদের কোনো বিচার হতে পারবে না। আপনি যে তদ‌ন্তের কথা বলছিলেন, আমরা সেখানে প্রধান বিচারপতিকে রেখেও তদন্ত কমিটি করতে পারতাম।

প্রথম আলো: কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হকের করে দেওয়া একটা খসড়া আপনারা আদালতে দিয়েছেন। সেখানে ছিল, প্রাথমিক তদন্ত কমিটির ১০ জনই সাংসদ থাকবেন। সেটা আদালতকে উদ্বিগ্ন করেছে।

তোফায়েল আহমেদ: কিন্তু তা চূড়ান্ত কিছু ছিল না। খসড়া ছিল মাত্র।

প্রথম আলো: সংসদের আসন্ন অধিবেশনে আমরা এ বিষয়ে ঝড় আশঙ্কা করছি। কিন্তু কোনো গঠনমূলক সাংবিধানিক সংস্কারের দিকে আপনারা যাবেন, তা ধারণা করা যায় না।

তোফায়েল আহমেদ: মূল সংক্ষিপ্ত রায়ের পর আমি নিজেই সংসদে বক্তৃতা দিয়েছি, তখন গঠনমূলকভাবে আলোচনা করেছি, এবারও তা-ই হবে।

প্রথম আলো: সংবিধান ও কার্যপ্রণালিবিধিতে বিচারকদের আচরণ নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ রয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ: আমরা সেখানে গঠনমূলক আলোচনা করব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, ১০ জন অ্যামিকাস কিউরি বা আদালতের বন্ধু হলেন, তাঁরা কারা? টি এইচ খান জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী ছিলেন। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ভিন্ন দলে গিয়ে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করছেন। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একজন সমালোচক।

প্রথম আলো: কিন্তু ড. কামাল হোসেন স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেননি, বাধ্য হয়েছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ । ছবি: সাজিদ হোসেন

তোফায়েল আহমেদ: তিনি স্বেচ্ছায় দল ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে গণফোরাম গঠন করেছিলেন। তিনি সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বলে দাবি করেন। কিন্তু ৯৬ অনুচ্ছেদের বিরোধিতা করেন। এসব আমাদের ব্যথিত করে। রোকনউদ্দিন মাহমুদ হাইকোর্টে বলেছেন এক কথা, সুপ্রিম কোর্টে আরেক কথা। এ জে মোহাম্মদ আলী বিএনপির অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তাঁর সেই দুঃসহ দৌড় গোটা জাতি ভুলতে পারেনি। আমরা যখন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের অবৈধভাবে প্রধান উপদেষ্টা হওয়াকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, তখন তিনি দৌড়ে গিয়ে প্রধান বিচারপতিকে দিয়ে বিচার স্তব্ধ করিয়েছিলেন। হাসান আরিফ বিএনপির অ্যাটর্নি জেনারেল, ওয়ান-ইলেভেনে উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বিএনপি ঘরানার লোক। বিএনপির সময় তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। যাঁরা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ, তাঁরা কেউ কি আদালতের বন্ধু হতে পারলেন না? আসলে ষোড়শ সংশোধনীর বিরুদ্ধাচরণ করার চিন্তা থেকেই বন্ধু বাছাই করা হয়েছে। ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম গর্ব করে বলেন, তাঁরা সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা। তাঁরা কী করে বাহাত্তরের বিধানের বিরোধিতা করতে পারেন।

প্রথম আলো: শুধু প্রধান বিচারপতি নন, সব বিচারকই আলাদাভাবে ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এই অনুচ্ছেদটির কারণেই বিচারকদের অপসারণের ভার সংসদের কাছে রাখা যায় না। কারণ, বাংলাদেশে সংসদ ও সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

তোফায়েল আহমেদ: ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। শিখতে গিয়েছিলাম। ক্ষমতাসীন দল কয়েকজন সংসদ সদস্যকে কিনেছিল। পরে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাওয়ের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিচারিক আদালতে তিনি দণ্ডিতও হয়েছিলেন। এটা বন্ধ করতেই ৭০ অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে। এর প্রয়োগ শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে। এই যে এবারের বাজেট হলো, আমাদের দলীয় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা দলীয় সংসদ সদস্যরা করেননি? বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা। তিনি মন্ত্রিসভা, সংসদ ও দলের নেতা।

প্রথম আলো: এবং তা এতটাই নিরঙ্কুশ যে সুপ্রিম কোর্টসহ সব সাংবিধানিক সংস্থার সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই দেন। ক্ষমতার পৃথক্‌করণ বলতে এ রাষ্ট্রে কিছু নেই!

তোফায়েল আহমেদ: সেটা যদি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী থেকেও বেশি শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাবেন

 প্রধান বিচারপতি। কারণ, তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন। আবার এখন ১১৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা নিয়ে নিতে চাইছেন। তার মানে অধস্তন আদালতের সব বিচারকের ওপর তাঁরই একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

প্রথম আলো: ভুল করছেন, এটা ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির বিষয় নয়, ক্ষমতাটা পাবেন সুপ্রিম কোর্ট। বাহাত্তরের সংবিধানে তা-ই লেখা ছিল।

তোফায়েল আহমেদ: সুপ্রিম কোর্ট লেখা হলেও বাস্তবে এবং কার্যত প্রধান বিচারপতিই এই ক্ষমতা অনুশীলন করবেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে সাতজন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতি ছাড়া আর কোন বিচারকের বক্তব্য প্রতিদিন খবরের কাগজে প্রকাশ পাচ্ছে? আর কোন বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার সময় বিচারবহির্ভূত প্রসঙ্গে অহরহ মন্তব্য করেন? আর কে প্রম্পট করেন? একমাত্র প্রধান বিচারপতি। আপনি প্রধানমন্ত্রীকে দেখালেন? ১১৬ অনুচ্ছেদ তাঁর হাতে গেলে তিনি হবেন নাথিং বাট আ গড। অন্য বিচারকেরা কেউ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু এ রকম হস্তক্ষেপ করেন না। যদি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে তাঁর বিচার করবে কে?

প্রথম আলো: তখন তিনি কাউন্সিলে বসবেন না।

তোফায়েল আহমেদ: তাঁকে বাদ দিয়ে যে তিনজন বসবেন, তাঁরা কি প্রধান বিচারপতির বিচার করতে পারবেন? তাঁরা কি তাঁর বিরুদ্ধে অপসারণের সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন? তাঁরা কি প্রধান বিচারপতির দুর্নীতির তদন্ত করতে পারবেন? বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা যেটা দেখছি, প্রধান বিচারপতি যদি কোনো একটি বিষয়ে নির্দেশনা দেন, তখন তার ফল কী দাঁড়াবে? বিচার বিভাগ নিয়ে অহেতুক সমালোচনার লোক আমি নই। গণপরিষদে আমারও দস্তখত রয়েছে। বয়সের হিসাবে অনেক বিচারকই তখন স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এখন যে রাষ্ট্রপতি আমাদের দ্বারা নির্বাচিত, তাঁর দ্বারা যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত, এখন তাঁদের কাছে আমরা হলাম অপরিপক্ব। আর তাঁরা হলেন পরিপক্ব। এসব আমাদের ব্যথা দেয়। কষ্ট দেয়।

প্রথম আলো: কিন্তু রায়ে সংসদ সদস্যদের নয়, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অপরিপক্ব বলা হয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ: আরে, এটাই তো অত্যন্ত খারাপ কথা। বিশ্বের যেখানেই এই ব্যবস্থা আছে, তাদের সংসদগুলো পরিপক্ব, এই মানদণ্ডের ভিত্তি কী?

প্রথম আলো: কিন্তু প্রধান বিচারপতি নিজেদের একটা সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, বিচার বিভাগ অপেক্ষাকৃত উত্তম। পানির ওপরে নাক উঁচু করে রেখেছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ । ছবি: সাজিদ হোসেন

তোফায়েল আহমেদ: এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, দেশটি একটি অকার্যকর দেশ। নির্বাহী বিভাগ ব্যর্থ। সংসদ ব্যর্থ। সুপ্রিম কোর্ট ডুবুডুবু অবস্থায় মাথা উঁচু করে আছে। আর এটা সর্বোচ্চ আদালত কখন উচ্চারণ করেছেন? যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন উচ্চতায় উঠেছে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্বের সব জায়ান্ট অর্থনৈতিক গুরু স্বীকার করছেন। তেমন একটি অবস্থায় প্রধান বিচারপতি কী করে এমন পর্যবেক্ষণ দিতে পারেন? তাঁরা বলছেন, সংসদের কাছে অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হলে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ, সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়।

প্রথম আলো: অর্থনীতির উন্নতি আর রাজনীতির উন্নতি এক নয়। আপনার কেন মনে হয়, আমাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট পরিপক্বতা অর্জন করেছে?

তোফায়েল আহমেদ: আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এখানে আমরা সবাই পোড়-খাওয়া সাংসদ নই। অনেক নবীন আছেন। আমি নিজেও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমি দাবি করি না। আমিপ্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করছি। আপনি কি এই দাবি করবেন যে যাঁরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের আসনে রয়েছেন, তাঁরা সবাই পরিপক্ব? যাঁরা সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হিসেবে নিয়োগলাভ করেছেন, তাঁরা আমাদের একেবারে অপরিচিত নন। রাজনীতির বিষয় এখানে টানা ঠিক নয়। তদুপরি আমরা তা উপেক্ষাও করতে পারি না। বিএনপির সময় নয়জন বিচারক প্রধান বিচারপতির সুপারিশ সত্ত্বেও নিয়োগ পাননি। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী তাঁদের একজন। আবার প্রধান বিচারপতি সৌভাগ্যবান। বিএনপি তাঁকে স্থায়ী বিচারক পদে নিয়োগ দিয়েছিল। জেনারেল এরশাদের আমলে বয়স কমিয়ে প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনকে অপসারণ করা হয়েছিল। আবার বয়স বাড়িয়ে বিচারপতি কে এম হাসানকে বিএনপি প্রধান উপদেষ্টা পদে যোগ্য করে তুলেছিল।

প্রথম আলো: এখন আপনারা প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে চাপ সৃষ্টি করছেন?

তোফায়েল আহমেদ: না, আমরা কোনো চাপ প্রয়োগ করতে যাব না। খেয়াল করবেন, আমরা কিন্তু রায় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছি না। আমরা কথা বলছি তাঁর পর্যবেক্ষণ নিয়ে। যে পর্যবেক্ষণ অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও অযাচিত, যা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা দিয়ে যে কত খারাপ হয়েছে এবং বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অপসারণ ব্যবস্থা সংসদের কাছে রাখা যাবে না ভালো কথা, আপনারা নিয়ে নেবেন। কিন্তু এত কথা কেন? আমি শুধু এটুকুই বলব, কেউ যাতে মিসকোটের সুযোগ না পায়, সে জন্য প্রধান বিচারপতির উচিত সতর্ক হওয়া।

প্রথম আলো: পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ সংশোধনীতেও অনেক পর্যবেক্ষণ ছিল। কিন্তু তা আপনাদের খুশি ও বিএনপিকে অখুশি করেছিল। আপনারা রায় মেনে সংবিধান ছাপিয়েছিলেন। আর এখন কত ওজর-আপত্তি।

তোফায়েল আহমেদ: কিন্তু আমরা আমাদের খুশি হওয়া প্রকাশ করিনি। আমরা বিএনপির মতো আনন্দ উৎসব করিনি। মিষ্টি বিতরণ করিনি। এই রায়ের পর মিষ্টি খাওয়া থেকে শুরু করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। আমরা পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পর বিএনপিকে নিষিদ্ধ করার দাবি করিনি।

প্রথম আলো: জিয়াকে নোংরা রাজনীতির ধারক-বাহক বলার পরও বিএনপির কথিত মিষ্টি খাওয়াকে আপনারা স্বাগত জানাতে পারতেন।

তোফায়েল আহমেদ: এটা বিএনপির অজ্ঞতা। মওদুদ আহমদসহ যাঁরা বক্তব্য দেন, তাঁরা অবশ্য জানেন, জিয়ার সরকার অসাংবিধানিক ছিল। মওদুদ নিজেও তাঁর বইয়ে লিখেছেন। কিন্তু তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হলো, আমাদের যা বিরুদ্ধে গেছে, তা তাদের উৎফুল্ল করেছে।

প্রথম আলো: কিন্তু তাদের অজ্ঞতার ওপর আপনার এত আস্থা কেন? এমন তো হতে পারে, যা অবৈধ শাসন, সেটাই হয়তো সত্য।

তোফায়েল আহমেদ: আমার মনে হয়, তারা যখন রায়কে ঐতিহাসিক বলেছিল, তখন তারা রায়টি পড়েনি। ইদানীং দেখবেন, বিএনপির উৎসাহে ভাটির টান লেগেছে। উঁচু গলা নিচু গলায় পরিণত হচ্ছে। আপনিই তো খন্দকার মাহবুবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর তিনি বলেছেন, রায়ে একদিকে জিয়াকে অবৈধ শাসক বলা, অন্যদিকে তাঁর আমদানি করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রেখে দেওয়ার মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে।

প্রথম আলো: মন্ত্রিসভার কোনো কোনো সদস্যের রূঢ় ও আদালত অবমাননাকর মন্তব্য প্রমাণ দিচ্ছে যে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে থাকা নিরাপদ নয়।

তোফায়েল আহমেদ: যে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তাঁদের নিজস্ব। তবে আমি মনে করি, আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন। বিচার বিভাগের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে। তাঁদের রায় নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করিনি। প্রধানমন্ত্রীও সুপ্রিম কোর্টের যে মূল রায়, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। যেদিন বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচিত হয়েছিল, সেদিন আমাদের প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিষয়ে একটি মন্তব্যও করেননি।

প্রথম আলো: কিন্তু ২১ আগস্টের আলোচনা সভায় তিনি কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদ: না, আপনি ভুল করছেন। রায় নিয়ে নয়, পাকিস্তান প্রসঙ্গে বিচারকার্যের বাইরে প্রধান বিচারপতি ব্যক্তিগতভাবে যে মন্তব্য করেছেন, তিনি তার উত্তর দিয়েছেন এবং সেটা তিনি সঠিকভাবে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদেরও বলেছেন, রায় ভালোভাবে পড়তে। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মুনিরের একটি বই হলো জিন্নাহ টু জিয়া। জিয়া মানে জিয়াউল হক। সেই বইয়ে তিনি সামরিক শাসনকে বৈধ শাসন বলেছিলেন। ডকট্রিন অব নেসেসিটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। সেই পাকিস্তানের সঙ্গে আপনি তুলনা করেন কীভাবে। এটাই তো আমাদের দুঃখ। এই দুঃখ ও আক্ষেপের একটা প্রতিফলন সেদিন তাঁর বক্তৃতায় ঘটেছে।

প্রথম আলো: কিন্তু সমালোচকদের মতে, সেখানে পরিমিতিবোধের বিরাট ঘাটতি ছিল।

তোফায়েল আহমেদ: না, আমি তা মনে করি না। তিনি যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল বক্তব্য রেখেছেন। আমরা পাশে থেকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তৃতা শুনেছি। তিনি দেশের মানুষের কথা বলেছেন।

প্রথম আলো: সংসদে আলোচনার রূপরেখাটা কী হতে পারে, বিকল্প কোনো সংস্কারের দিক নিয়ে আলোচনা?

তোফায়েল আহমেদ: দেখুন, রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ নিয়ে তো আলোচনা হবেই। সর্বোচ্চ আদালত যখনই কোনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রায় লিখেন, তখন একটি সমাজের সংবেদনশীলতা ও বাস্তবতা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রতীয়মান হয় যে এই বেঞ্চের অন্য বিচারকেরা তাঁর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বিষয়ে একেবারেই নিস্পৃহ ছিলেন। কারণ, ‘আমি’ ও ‘আমরা’র মতো কিছু বিষয় রয়েছে, যা শুধু প্রধান বিচারপতিই লিখেছেন। আমি তো বলব, ‘আমিত্ব’-এর যে সমালোচনা তিনি করেছেন, সেই ‘আমিত্ব’-এর বহিঃপ্রকাশ তাঁর নিজের দেওয়া পর্যবেক্ষণেও ঘটেছে। এই পার্লামেন্ট জিয়া ও এরশাদের পার্লামেন্ট নয়। যেখানে শাহ আজিজ ও মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সার্বভৌম পার্লামেন্ট।

প্রথম আলো: আমরা প্রমাণ দিতে পারি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক্‌করণে আপনারা বিশ্বাসী নন। তার প্রমাণ জিয়ার করা সর্বাধিক ফরমান বিচার বিভাগে এখনো টিকে আছে।

তোফায়েল আহমেদ: যেমন?

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ । ছবি: সাজিদ হোসেন

প্রথম আলো : ৯৯ অনুচ্ছেদ, অবসরের পর বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের চাকরি নিন, সেটা বাহাত্তরে ছিল না, এমনকি বঙ্গবন্ধু এতে ৭৫ সালেও হাত দেননি। অথচ জিয়া ফরমান দিয়ে এটা করেছেন যে তাঁরা অবসরে গিয়েও সরকারের সংশ্রবে কাজ করবেন। এভাবে জিয়া বিচারকদের প্রলুব্ধ করেন।

তোফায়েল আহমেদ: আপনার লেখা ধরেই বলি, এই ৯৯ অনুচ্ছেদে জিয়ার ফরমানের মার্জনা বর্তমান প্রধান বিচারপতিই করেছিলেন। অথচ তিনি যখন পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে আপিল বিভাগে কনিষ্ঠ বিচারক ছিলেন, তখন তিনি ৯৯ অনুচ্ছেদ মার্জনা না করতে একমত হয়েছিলেন। তাহলে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কী করে লেখা হলো, সুপ্রিম কোর্ট যাকে অসাংবিধানিক বলল, সংসদ তাকে পরে গ্রহণ করেছে। এটা শুধু তথ্যগত অসংগতি নয়, আমি তো বলব, এটা রায়ের সমন্বয়হীনতারও সাক্ষ্য বহন করছে। এখন আপনিই বলুন, সংসদকে অহেতুক দায়ী করার এ রকম বিষয় যা রায়ে আছে, তা কেন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এক্সপাঞ্জ হবে না? না হলেই বরং বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে।

প্রথম আলো: অন্য বিচারকও ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাই সংসদের প্রতি আস্থাহীনতা শুধু প্রধান বিচারপতি দেখিয়েছেন, তা সত্য নয়।

তোফায়েল আহমেদ: এটা একটা অবাস্তব কথা। ৭০ অনুচ্ছেদ যদি না-ও থাকে, আর দল যদি একটা সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কে যাবে দলের বিরুদ্ধে? বাহাত্তরে আলাপ করেই ড. কামাল ৭০ ও ৯৬ অনুচ্ছেদ রেখেছিলেন। এখন তাঁরা আদালতের বন্ধু হয়ে গেছেন। আমরা স্ববিরোধিতায় ভুগি না।

প্রথম আলো: অবশ্যই আপনারা স্ববিরোধিতায় ভোগেন, উদাহরণ দিই। ২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইন পুরোটা বাতিল হলো, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ চাইলেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তা করলেন না। অথচ আপনারা নীরব থাকলেন। এখন আপনাদের শ্রেণিস্বার্থে লেগেছে বলেই কি উচ্চকিত?

তোফায়েল আহমেদ: না, এটা মোটেই ঠিক নয়। বাংলাদেশে বাক্‌স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বাধীনতাও আছে। তাই এগুলো মোটেই সঠিক কথা নয়।

প্রথম আলো: দায়িত্বশীলরা অনেক অযথাযথ ও অসংসদীয় কথা বলেন। এর প্রাধান্য দেখতে পান না? তা প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাংসদদের বিচলিত করে কি?

তোফায়েল আহমেদ: না, প্রাধান্য নয়। আমরা শক্ত ভাষায় কথা বলি কিন্তু তা সংসদীয়। বিএনপি সংসদে থাকতে মহিলা এমপিরা যা ইচ্ছা তা-ই বলতেন। আপনার এই অযাচিত প্রশ্নের কোনো মানে হয় না। কারণ, সবার কথা এক রকম নয়। কথা বলার একেক রকম একটি ভঙ্গিমা ও আর্ট আছে।

প্রথম আলো : আচ্ছা, ২০১১ সালে কেন আপনারা ১৫০ অনুচ্ছেদে এটা পাস করলেন যে নিম্ন আদালত পাকিস্তানি কায়দায় চলবে?

তোফায়েল আহমেদ: এই প্রশ্নের উত্তর আইনমন্ত্রী ভালো দিতে পারবেন। তবে আমরা ১৫০ অনুচ্ছেদে নিম্ন আদালত বিষয়ে যেটা বলেছি সেটা হলো, সংবিধান প্রণয়নের আগের মতো চলা। পাকিস্তানি কায়দায় নয়। আর আমরাই তো পৃথক্‌করণের পথে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। পৃথক্‌করণের বিল আমরাই পাস করেছি। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনামতে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম সরকারের আমলেই দিয়েছিলেন।

প্রথম আলো: অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাহাত্তরে ফিরিয়ে নিতে সুপ্রিম কোর্টের অন্তত ছয়জন প্রধান বিচারপতি অভিন্ন মত দিয়েছেন। আপনি কী বলবেন?

তোফায়েল আহমেদ: আমি মনে করি, এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল যথাযথ অভিমত দেওয়ার জন্য উপযুক্ত। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাঁদের হাতে গেছে, এখন যদি এই ক্ষমতাও সম্পূর্ণরূপে বিচার বিভাগের কাছে চলে যায়, তাহলে সেটা জাতীয় প্রশাসনে একটা ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রথম আলো: কিন্তু এটা অবিশ্বাস্য যে স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর লিখবেন, আমরা পাকিস্তানের মতো চলব। নিম্ন আদালতের চারটি অনুচ্ছেদকে অকার্যকর করে বলবেন, যথাশিগগির বাস্তবায়ন করবেন।

তোফায়েল আহমেদ: এটা পাকিস্তানের সঙ্গে মেলাবেন না।

প্রথম আলো: কিন্তু কথাটার মানে তা-ই দাঁড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলবেন, আপনারা গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দাবি করবেন, তাহলে সংবিধানের আগে কেন ফিরব?

তোফায়েল আহমেদ: এভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে মেলাবেন না। আমাদের সংবিধান আসার আগে যেখানে ছিলাম, আমরা সেখানে ফিরতে চেয়েছি। পাকিস্তানে পুলিশ বাহিনী আছে। আমাদের দেশেও পুলিশ আছে। তাদের ভালো-মন্দ যদি মিলিয়ে দেখেন, সেটা ভিন্ন কথা। এর সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো মিল নেই।

প্রথম আলো: ভারতসহ সব উন্নত গণতন্ত্রে অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা শতভাগ সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত। যে যুক্তিতে মূল ৯৬ অনুচ্ছেদে থাকা সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা স্বীকার করেন, সেই যুক্তি থাকতেও মূল ১১৬ অনুচ্ছেদমতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাতিলের যুক্তি অস্বীকার করেন। বড় পরিহাস, তাই না?

তোফায়েল আহমেদ: আমরা অস্বীকার করি না।

প্রথম আলো: আপনারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাতিল চান না। এখানে বাহাত্তরে ফিরতে চান না।

তোফায়েল আহমেদ: কতগুলো জায়গা আছে, যেখানে আমরা বাহাত্তরে ফিরতে পারি না। যেমন বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম।

প্রথম আলো: এসব বিষয়ে বিএনপির বিরোধিতার রাজনীতিটা না হয় বুঝলাম কিন্তু অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে কেন আমরা বাহাত্তরে ফিরব না?

তোফায়েল আহমেদ: জাতির পিতা মূল ৩৮ অনুচ্ছেদে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। আপনি আমাদের দুষছেন, সুপ্রিম কোর্ট এত বড় বড় রায় দিলেন, এখানে নীরব থাকলেন।

প্রথম আলো: সেটা রাষ্ট্রধর্মের বিষয়ে বলতে পারেন। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিসংক্রান্ত মূল ৩৮ অনুচ্ছেদ তাঁরা মার্জনা করেননি। আমরা তাই লিখেছি, রায়ের ফলে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আপনারাই ২০১১ সালে রায় অনুসরণ না করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রাখলেন, মূল ৩৮ অনুচ্ছেদ কর্তন করলেন। জামায়াতকে জীবন দিলেন।

তোফায়েল আহমেদ: আমরা রাষ্ট্রীয় মূল চার নীতি ফিরিয়ে এনেছি। জিয়াউর রহমান এটা বাতিল করেছিলেন।

প্রথম আলো: সেটা একটা অগ্রগতি। কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ও সেক্যুলারিজম একসঙ্গে যায় কি?

তোফায়েল আহমেদ: সংবিধানে যা-ই থাক, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

প্রথম আলো: প্রধান বিচারপতি ছাড়া রায়দানকারী অন্তত চারজন বিচারক চতুর্থ সংশোধনীকে (একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা) মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলেছেন। কী বলবেন? ঐতিহাসিক ভুল?

তোফায়েল আহমেদ: না, মোটেই না। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতির পিতা জাতীয় ঐক্য গড়তে একটি ভিন্নতর রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আজ যে উচ্চতায় দেশকে নিয়েছেন, তেমন স্বপ্নই তিনি দেখেছিলেন। তার সঙ্গে অন্য কোনো সিস্টেম তুলনীয় নয়। এই কারণে তাঁকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়নি। আপনার লেখাতেই আছে, খুনি ফারুককে বাহাত্তর-তিয়াত্তরে মার্কিন দূতাবাসে দেখা যায়।

প্রথম আলো: বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আপনাদের কী কথা হলো?

তোফায়েল আহমেদ: আমরা সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। ছাত্রজীবন থেকে রাষ্ট্রপতি আমার অতি আপন লোক। আমির হোসেন আমুর সঙ্গেও সেভাবে তাঁর সখ্য। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর একত্রে কারা নির্যাতন সয়েছি। সেখানে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে…।

প্রথম আলো: প্রধান বিচারপতি প্রসঙ্গও ছিল নিশ্চয়।

তোফায়েল আহমেদ: কোনো একটি সমস্যা কেউ সৃষ্টি করতে চায় না। সামনে নির্বাচন। আমরা একটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে চাই। প্রধান বিচারপতির যেসব পর্যবেক্ষণ অপ্রয়োজনীয়, আইনমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সে মতে যদি বাদ পড়ে, তাহলে তো আর সমস্যা থাকে না। আইনমন্ত্রী নিজেও একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ, তিনি এ বিষয়ে আমাদের মুখপাত্র। তিনি যেভাবে বলছেন, সেভাবেই আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। আপনি জানবেন, প্রধান বিচারপতি এফ কে মুনিমের কোর্ট বয়কট হয়েছিল। আমরা সেই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা চাই না। আমি মনে করি, যিনি প্রধান বিচারপতি, তাঁরও অবসরের সময় এসে গেছে। আশা করব তিনি সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেবেন। সংসদে যখন কোনো অসংসদীয় ভাষার ব্যবহার ঘটে, তখন স্পিকার তা এক্সপাঞ্জ করেন। আপিল বিভাগের রুলসেও আছে, তা ছাড়া বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী ও বিচারপতি এম এ মতিনও বলেছেন, সুতরাং বিষয়টি সেই পথেই যাওয়া উচিত। তাঁদের কেউ এটাও স্বীকার করেছেন যে কিছু বিষয়ের কোনো দরকার ছিল না।

প্রথম আলো: ৯৭ অনুচ্ছেদ নিয়ে কোনো চিন্তা? সত্যি কি না?

তোফায়েল আহমেদ: কেউ যদি এক্সট্রিম কিছু করতে চান বা কারও বিরুদ্ধে যদি তেমন কোনো বিষয় থাকে, যেটা ৯৭-এ পরিষ্কার লেখা আছে, যদি কেউ অসুস্থ হন, (তিনি ৯৭ অনুচ্ছেদ পড়ে শোনান)।

প্রথম আলো: বাহাত্তরে এটা আমরা ভারতের ১২৬ অনুচ্ছেদ থেকে এনেছি। তবে কর্মে প্রবীণতমকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করার কথাটি ভারতে নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু সেটা যুক্ত করেছিলেন। এখন শুনছি সেটা ছেঁটে ফেলা হবে। বিলের খসড়া তৈরির বিশ্বাসযোগ্য খবর পাচ্ছি।

তোফায়েল আহমেদ: কেউ ইচ্ছা করলেই তা হয় না। এ রকম কোনো চিন্তাভাবনা নেই। প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের যাঁরা বিচারক রয়েছেন, সবার প্রতি আমরা সম্মান প্রদর্শন করি। আমি এভাবে দেখি, আমার কাজে কোনো ভুল হলে তা শোধরাতে ক্ষতি কী। তাই যেটুকু অপ্রাসঙ্গিক, সেগুলো বাদ দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

তোফায়েল আহমেদ: ধন্যবাদ।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply