khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

কোটিপতি উপাচার্যগণ এবং তাদের নৈতিকতার মানদণ্ড

0 36

 

জহিরুল হক মজুমদার: বিবিধ যোগাযোগ মাধ্যম বেশ কিছুদিন সরব ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের কোটি টাকারও অধিক ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ না-নেওয়া নিয়ে। তিনি কতটা সৎ এই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছেন অনেকে। তবে এর ভিতর দিয়ে অন্য আরেকটি সত্য বের হয়ে এসেছে যে, উপাচার্য হলে কোটিপতিও হওয়া সম্ভব। শিক্ষকতার গাম্ভীর্য থেকে বের হয়ে এসে একটু কৌতুক করার সুযোগ নিলে, উপাচার্যের চেয়ারটিকে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’এর ‘হট সিট’এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যদিও জটিল ধাঁধাঁপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে কোনো দরাজ গলার বিগ বি সামনে নেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজকাল কোটিপতি বলতে ঠিক এক কোটি টাকার মালিককে বুঝায় না। ব্যাংকের অর্থ লুটপাটকারী, সোনা চোরাচালানি, মাদকদ্রব্য পাচারকারী এবং মাদক ব্যবসায়ী, সরকারি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং সরকারি দপ্তরের পেশাদার ঘুষখোরদের কাছে এক কোটি টাকা খুচরো টাকা মাত্র!

অপরদিকে, এভাবেও ভাবার অবকাশ রয়েছে যে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর চাকুরি করে একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক সব মিলিয়ে বর্তমান পে-স্কেলে মাত্র সত্তর-আশি লাখ টাকা কিংবা খুব বেশি হলে এক কোটি টাকা এককালীন পেনশন হিসেবে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান, সেখানে একজন উপাচার্যের সাত বছরের সিটিং অ্যালাউন্সই কোটি টাকা! অর্থাৎ এক মেয়াদের চার বছর উপাচার্য থাকলেও তা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। এছাড়া উপাচার্যের নিজের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধাদি তো রযেছেই। উপাচার্য হওয়া কতটা লাভজনক এর ভিতর দিয়ে জনসমাজের কাছে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

শুধুমাত্র বিবিধ মিটিংএ অংশগ্রহণ করার জন্যই এই সিটিং অ্যালাউন্স প্রদান করা হয়। আর এই লাভের গুড় খাওয়ার জন্যই হয়তো শিক্ষক রাজনীতির কুশীলবদের একাংশের ইঁদুর দৌড় আর শেয়ালের মতো ধূর্ত আচরণ, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছে নতজানু হওয়া, দলীয় মিটিংএ হাতাহাতি থেকে শুরু করে পুরুষ হয়ে মহিলা সহকর্মী শিক্ষককে মারতে তেড়ে যাওয়ার মতো অশোভন এবং গুরুতর দণ্ডযোগ্য আচরণগুলো দেখা যায়। মিডিয়ায় এজন্যই ক্ষমতাসীন সরকারের ভুলগুলোও প্রশংসায় ফেনিয়ে তোলার ঘটনা তো সাধারণ।

আমার বেদনার জায়গাটি সীমিত আয়ে চলা সাধারণ শিক্ষকদের নিয়ে, যারা জীবনের শেষ দিকে উপাচার্যের সিটিং অ্যালাউন্সের সমান কিংবা এর চেয়েও কম টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন এবং অনেকে জীবনে প্রথমবারের মতো পেনশনের টাকায় একটি আবাস অন্বেষণ করবেন। এটা অনেকটা সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিত মশায়ের মাসিক বেতন ইংরেজ সাহেবের তিন পাওয়ালা কুকুরের কয় পায়ের খরচের সমান’ সেই গল্পই মনে করিয়ে দেয়।

এর বিপরীতে অবাক বিস্ময়ে দেখতে হয়, সিটিং অ্যালাউন্সের নামে কীভাবে উপাচার্য থেকে শুরু করে নিজ দলীয় শিক্ষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত বরাদ্দের মধ্যে এই সিটিং অ্যালাউন্স কতটা যুক্তিযুক্ত এই প্রশ্ন তোলাও অযৌক্তিক হবে না। বিবিধ রকমের সভা কর্মসম্পাদনের একটি পদ্ধতি মাত্র। সুতরাং অফিস চলাকালীন যদি কোনো সভা করার প্রয়োজন পড়ে সেখানে সিটিং অ্যালাউন্স থাকবে কোন যুক্তিতে? তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পদাধিকারীদের বেতন দিচ্ছে কেন?

অফিস চলাকালীন যদি সভা করার প্রয়োজন পড়ে সেখানে সিটিং অ্যালাউন্স থাকবে কোন যুক্তিতে? তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পদাধিকারীদের বেতন দিচ্ছে কেন?

এ বিষয়ে সকলেই অবগত আছেন যে, সিন্ডিকেট সদস্যদের সহকর্মীরা নির্বাচন করেছেন সিন্ডিকেট সভায় উপাচার্যকে মতামত দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য। এটি একটি সেবামূলক কাজ এবং কোনোভাবেই বিভাগীয় চেয়ারম্যান কিংবা অনুষদের ডিনদের মতো পূর্ণকালীন দায়িত্ব নয়। সেখানে সিন্ডিকেট সভায় অংশগ্রহণের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ নৈতিকতা-বহির্ভূত।উপাচার্য কয়টি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করবেন, কেন এবং কোথায় করবেন এটি সম্পূর্ণ তাঁর এখতিয়ারভুক্ত। সুতরাং অধিক সংখ্যায় সিন্ডিকেট মিটিং করার প্রয়োজন দেখা দিলে আনুপাতিক হারে সিটিং অ্যালাউন্স খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে এবং সীমাও অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া সাধারণ শিক্ষক এবং রাজনৈতিক শিক্ষকদের মধ্যে আয়বৈষম্য বাড়তে থাকবে।

মূলত শিক্ষক রাজনীতি আরও রসে-বশে জিইয়ে রাখার জন্যই এই সিটিং অ্যালাউন্স চালু করা হয়েছে মনে হয়। এটা গত প্রায় দেড় দশকের সংস্কৃতি। এর আগে এ ধরনের কিছু ছিল বলে আমার জানা নেই। ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা কোনো বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের জন্যও ভ্রমণ ভাতা (টিএ), দৈনিক ভাতা (ডিএ) এবং নির্দিষ্ট কাজের বিল চালু ছিল সব সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন শিক্ষকদের জন্য পরীক্ষার হলের প্রত্যাবেক্ষণ, উত্তরপত্র নিরীক্ষণ, ফল সমন্বয়, ব্যবহারিক এবং মৌখিক পরীক্ষার বিল এবং কোনো অধিভুক্ত কলেজে পরিদর্শনের বিল চালু ছিল এবং আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমস্ত পরিষদে সাধারণ শিক্ষকদের অংশগ্রহণ আছে সেখানে কোনো সিটিং অ্যালাউন্স আছে বলে বলে জানা নেই। যেমন, চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির মিটিং (বিভাগীয় সকল শিক্ষক সদস্য), চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে বিভাগীয় উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির মিটিং (বিভাগের এক-তৃতীয়াংশ সিনিয়র শিক্ষক সদস্য), ডিনের সভাপতিত্বে অনুষদের মিটিং (অনুষদভুক্ত সকল বিভাগের সব অধ্যাপক সদস্য) এবং উপাচার্যের সভাপতিত্বে একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং (বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অধ্যাপক সদস্য)। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চিন্তাশীল বৃহৎ নাগরিক সমাজ এবং অভিভাবক সমাজের কাছে সাধারণ শিক্ষক হিসেবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রাখার জন্য এই তথ্য জানিয়ে রাখা জরুরি।

সিটিং অ্যালাউন্স সেখানেই চালু করা আছে যেখানে শিক্ষক-রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্বাচিত আছেন, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কিংবা ফাইন্যান্স কমিটি। এছাড়া শিক্ষক কিংবা ছাত্রদের অসদাচরণ, বিধি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্ত কমিটিগুলোতেও এই অ্যালাউন্স রয়েছে। এ সমস্ত তদন্ত কমিটি সিন্ডিকেট থেকে গঠন করা হয় এবং সেখানে সিন্ডিকেটের এক বা একাধিক সদস্যের সঙ্গে শিক্ষক বা অফিসার তদন্ত কমিটিতে থাকেন। যে সমস্ত শিক্ষককে এইসব তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয় তাদের অনেকেরই ক্ষমতাসীন শিক্ষক রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতা থাকতে দেখা যায়। দলনিরপেক্ষ সাধারণ শিক্ষকদের খুব কমই থাকেন ওইসব কমিটিতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শিক্ষক কোন রঙের রাজনীতি করেন এটা অস্পষ্ট থাকে না সহকর্মীদের কাছে, এমনকি ছাত্রদের কাছেও। তদন্ত কমিটিতে একজন অফিসারের সংশ্লিষ্টতা সাচিবিক সহযোগিতার জন্য, যা একান্তই প্রয়োজনীয়। কমিটির প্রত্যেকটি মিটিংএ সিটিং অ্যালাউন্স থাকে। এ কারণে তদন্ত কমিটিতে থাকা ওই সমস্ত রাজনৈতিক শিক্ষকের জন্য লাভজনক।

ছাত্রআন্দোলনের মুখে অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর বিদায়ের পর, বিগত বিএনপি সরকারের সময় অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন, তখন শুধুমাত্র পরীক্ষার হলে নিরাপত্তা পরিদর্শনের বিল হিসেবে সহকারী প্রক্টররা পঁচিশ-ছাব্বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল নিয়েছিলেন। যা গণমাধ্যমে সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল এবং শিক্ষক, ছাত্র থেকে শুরু করে সর্বমহলে সমালোচিত হয়েছিল।

সিনেট অধিবেশনে লিখিত বক্তব্যে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত প্রো-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ সকলেই বিভিন্ন পর্যায়ের সভাসমূহের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন। শুধু আমাদের মাননীয় উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি কমানোর জন্যেএ ধরনের অ্যালাউন্স গ্রহণ করেননি। আমার হিসাবে গত সাত বছরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা সাশ্রয় করেছেন। উচ্চ নৈতিকতার এ এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত নয় কি?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক কামাল উদ্দিন সিনেট সভায় প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক কত টাকা সিটিং অ্যালাউন্স হিসেবে নেননি সেটি উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এই খাতে সর্বমোট বিশ্ববিদ্যালয়ের কত ব্যয় হল তা উল্লেখ করেননি। একই সঙ্গে ব্যক্তি হিসেবে ট্রেজারার নিজে, অন্যান্য কর্তাব্যক্তিগণ, সিন্ডিকেট সদস্যগণ এবং প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বিবিধ কাজে কে কত সিটিং অ্যালাউন্স পেলেন তা যদি প্রফেসর ফায়েজের সময়কার প্রক্টরদের হিসাবের মতো জানা যেত তাহলে বুঝা যেত পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র কী।

উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ঘাটতির সহায়ক হবে বলে মনে করে নিজের প্রাপ্য অ্যালাউন্স না নিয়ে থাকেন, তাহলে এই আর্থিক টানাপড়েনের বাজেটে অন্যদেরকে তা দেওয়া কতটা যুক্তি এবং নৈতিকতাসম্মত হয়েছে? একই সঙ্গে রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক সাধারণ শিক্ষকদের আয়বৈষম্য তৈরির এই প্রক্রিয়া কতটা নৈতিক হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলা যেতে পারে।

১৯২১ সালে শতবর্ষ পূরণ করতে যাওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম একই ধারায় চলেছে। মাঝখানে ১৯৭৩এর রাষ্ট্রপতির আদেশবলে নতুন করে শুধু সায়ত্তশাসন লাভ করেছে। সিন্ডিকেট প্রশাসনিক কাঠামো হিশেবে সব সময়ই ছিল, কিন্তু অন্য নামে ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রমে প্রধান তিন নির্বাহী ভিসি, প্রোভিসি এবং ট্রেজারারের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স ছিল না। রেজিস্ট্রার দপ্তরের অন্য প্রশাসনিক কর্তাদের জন্যও নয়। টিএ এবং ডিএ চালু ছিল যা অনিবার্য দাপ্তরিক ভ্রমণসাপেক্ষে।

প্রায় দেড় দশক আগে সিটিং অ্যালাউন্স ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যদি সাধারণ শিক্ষকদের কিছু বাড়তি পাওনার জন্য এর ব্যবস্থা করা হত তাহলে তাদের উপস্থিতি থাকে যে সমস্ত মিটিংএ, যেমন বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল, সে ক্ষেত্রে কেন করা হয়নি? তবে তা করা হলেও সেটা যুক্তিযুক্ত হত বলে মনে করি না। পৃথিবীর সব দেশেই একাডেমিক শিক্ষকদের কিছু প্রশাসনিক কাজ করতে হয়।

ট্রেজারার অধ্যাপক কামাল উদ্দিন সিনেট সভায় উপাচার্যের এই অর্থ গ্রহণ না করার বিষয়টি ‘উচ্চ নৈতিকতার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর আবেগের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলছি, বিষয়টির উল্টো পিঠ এবং উল্টো পাঠও রয়েছে। যা তাঁর বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত। উপাচার্য প্রফেসর আরেফিন হয়তো এই ধরনের অর্থগ্রহণ একেবারেই নৈতিক মনে করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে এই অর্থ গ্রহণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক রাজনীতির ‘অমরেশ পুরীদের’ চটাতে চাননি। কিন্তু নিজে নৈতিকতার ‘উত্তম কুমার’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন। তারপরও উপাচার্য সাধুবাদ পেতে পারেন নিঃসন্দেহে।

সিটিং অ্যালাউন্স সরকারি দপ্তরে একটি বহুল প্রচলিত ব্যাপার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপেক্ষাকৃত নতুন। সরকারি মাঠ প্রশাসনের কোনো কোনো কর্তার বরাতে জানা যায় যে, যত সংখ্যক মিটিং তাদের করতে হয় তার সিটিং অ্যালাউন্স দিয়েই তাদের মাসের খরচ চলে যায়, সরকার নির্ধারিত বেতনে হাত দিতে হয় না। এই জাতীয় অ্যালাউন্স বা আরও কিছু প্রান্তিক সুবিধাদিকে অনেকেসরকারি কর্মচারীদের সৎ থাকার প্রণোদনা হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকেন।

সরকার কাঠামোগতভাবে সুসংগঠিত হওয়ার কারণে প্রাপ্যতার বাইরে কোনো সুবিধা নেওয়ার অবকাশ খুব কম। যে ধরনের সুবিধাদি বা প্রাপ্যতা যে পদের জন্য যেভাবে নির্ধারিত আছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাই নেই। সেখানে পেশার ভিতর থেকে সাধারণত প্রশ্ন উঠে না। যদিও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক সুবিধাদি প্রয়োজন, চাহিদা এবং পেশাগত নৈতিকতার বিচারে অযৌক্তিক, এমনকি কথিত সিটিং অ্যালাউন্সও। আইনি কাঠামোর মধ্যেই এসব দেওয়া বলে এতে ব্যক্তির নৈতিকতা কোনোভাবে খাটো হয় না, কিন্তু বিষয়টি পেশাগত নৈতিকতাকে হেয় করে।

রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হয়তো সরকার পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারগুলোকে খুশি রাখার জন্য রাষ্ট্রের দিক থেকে এক ধরনের ‘পদ্ধতিগত এবং আইনগতভাবে বৈধ ঘুষ’ হিসেবে তা বজায় রেখেছেন। একদিকে ভালো যে, এর ফলে নাগরিকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার চেয়ে সরকারি কর্মকর্তারা ব্যক্তি-সততা বজায় রেখে কাজ করার একটি সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এতে ঘুষ খাওয়া খুব কমেছে এটাও আবার দাবি করা যাবে না। কাজ অনুযায়ী রেট করে ঘুষ খাওয়া লোকজন এখনও সরকারি দপ্তরে বিপুল সংখ্যায় রয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, ট্রেজারার কিংবা রেজিস্ট্রারের দপ্তর কাঠামোগতভাবে সুসংগঠিত হলেও, সাধারণ শিক্ষকদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের নির্দিষ্ট বিধি -কাঠামো নেই। যোগ্যতা কিংবা অভিজ্ঞতার বাছ-বিচার ছাড়াই দলীয় শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য পরিবর্তন হয়ে যায়, মেয়াদ থাকার পরও। হলের প্রভোস্ট, হাউজ টিউটর থেকে শুরু করে প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টররাও পদ হারান। বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং অনুষদের ডিন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো প্রশাসনিক কাঠামো রাজনৈতিক। যা জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতার আবর্তন অনুসরণ করে।

একই সঙ্গে দেখা যায় যে, সরকারদলীয় শিক্ষক সংগঠনগুলো এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের সভা বড় হতে থাকে। যেখানে তাদের মতাদর্শের রাজনৈতিক দল সরকারে না থাকার সময় শিক্ষক সংগঠনের মিটিংএ বিশ-পঁচিশ জনের বেশি উপস্থিতি থাকত না, সেখানে তাদের মতাদর্শের সরকার ক্ষমতায় গেলেই মিটিং লোকে ভরে ওঠে। আর চলতে থাকে পদ এবং সুবিধার বণ্টন। হাউজ টিউটরশিপ এবং ছোটখাট সুবিধার বিনিময়ে তরুণ মেধাবী শিক্ষকের মেরুদণ্ড ভাঙার কাজ চলতে থাকে অবিরত। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার শক্তি এবং জ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠা তরুণ শিক্ষক মুহূর্তের মধ্যে একজন নতজানু মানুষে পরিণত হন।

আশা করি জনসমাজ সাধারণ শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখবেন

এই রকম একটি পরিস্থিতিতে আর দশটা সুবিধার মতো সিটিং অ্যালাউন্সের সুবিধাও দলীয় শিক্ষকরাই পেয়ে থাকেন অনেকাংশে। তিয়াত্তর-উত্তর সময় থেকেই স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের দলভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা শিক্ষক রাজনীতি নামে পরিচিত। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই কথিত শিক্ষক রাজনীতি, পদের দৌড় আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে সাধারণ শিক্ষকদের বিপুল অংশের অংশগ্রহণ নেই।

তবু আশা করি জনসমাজ সাধারণ শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখবেন। বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ নৈতিকতার জায়গা। এখানে অনেক কিছু আইনিভাবে জায়েজ করলেও নৈতিক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে গেলে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিৎ নয়। শেষ বিচারে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষয় করে।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং আর্থিক সততা একই মাপকাঠিতে মাপা ঠিক নয়। আর্থিকভাবে সৎ এরকম অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি দপ্তরে রয়েছেন। তাঁরা সীমিত বেতনে সৎ থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন সংগ্রাম করছেন। তাঁরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ইতিহাসের পাতা তাদের জন্য বরাদ্দ নেই, মিডিয়ার নজরও নেই তাদের দিকে– আছে রাজনীতিবিদ, অধ্যাপক আর বুদ্ধিজীবীদের জন্য। খেটে-খাওয়া, ঘামের বিনিময়ে অন্ন রোজগার করা মানুষের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

এই বাস্তবতার আলোকেই বলতে চাই, শিক্ষককে আর্থিক এবং নৈতিক দুই দিক থেকেই সৎ হতে হবে। একটি প্রজন্মকে যারা মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছেন, যারা শুধু ছাত্রের শিক্ষক নন, সমাজেরও শিক্ষক—তাদের নৈতিকতার বিচারেও উত্তীর্ণ হতে হবে। একজন উপাচার্য যেহেতু শিক্ষক, তাঁর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিককে বিচারের ক্ষেত্রেও শুধু আর্থিক সততার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে, তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের নৈতিক দিকের দিকে নজর দিতে হবে। সে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেই কেবল তিনি পূর্ণ নৈতিকতার বিরল আসনে অধিষ্ঠিত হবেন।

প্রফেসর আরেফিনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী হওয়ার সুবাদে তাঁর অনেক কর্মের বিস্তারিত ফিরিস্তি এবং মূল্যায়ন নির্মাণ আমাদের মতো সহকর্মীদের পক্ষে সম্ভব। তাই উপাচার্য হিসেবে তাঁর কর্মের নৈতিক মান প্রসঙ্গে শুধুমাত্র বহুল আলোচিত একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই। বিষয়টি হচ্ছে নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম প্রসঙ্গে। যা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগে প্রভাষক নিয়োগে দেখা গেছে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেন না।

প্রভাষক এবং সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ বোর্ডের প্রধান হচ্ছেন সহ-উপাচার্য (শিক্ষা)। কিন্তু নিয়োগের যথার্থতা দেখা এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের কর্তৃপক্ষ ‘সিন্ডিকেট’, যার সভাপতি উপাচার্য নিজে। সিন্ডিকেট যে কোনো ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বাতিল কিংবা পুনঃবিবেচনার জন্য নির্বাচনী বোর্ডে ফেরত পাঠাতে পারেন। সিন্ডিকেট সভাপতি উপাচার্য কোনোভাবেই এই ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না। একই কথা প্রযোজ্য আর নির্বাচনী বোর্ডের সভাপতি সহ-উপাচার্যের (শিক্ষা) বেলায়।

এখানে নির্বাচনী বোর্ডের দোহাই তিনি দিতে পারেন না। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নির্বাচনী বোর্ড যা সুপারিশ করবেন বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট তার অনুমোদন দিতে বাধ্য নন। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে নিয়োগ বোর্ডের ত্রুটিপূর্ণ সুপারিশ বাতিল, পুনঃবিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো কিংবা নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশে বাদ পড়া, যোগ্য প্রার্থীকে সিন্ডিকেট থেকে সরাসরি নিয়োগের অনেক নজির রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেট, নির্বাচনী বোর্ড নয়। সুতরাং যে সমস্ত প্রার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকার কারণে ইন্টারভিউ কার্ড পাওয়ার কথা নয়, তারা যখন শিক্ষক হন তখন নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের সভাপতি হিসেবে এই দায় উপাচার্যের উপরই বেশি বর্তায়।

এখানে সিন্ডিকেট সদস্যদের কেউ ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দেননি কেন, এই যুক্তিও উপাচার্যের নৈতিক এবং প্রশাসনিক দায় কমায় না। সিন্ডিকেট সদস্যরা স্থায়ীভাবে কোনো অফিস চালান না। তাদের মধ্যে রয়েছেন সহকর্মীদের ভোটে নির্বাচিত শিক্ষকগণ এবং এর বাইরে সরকার এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রেরিত প্রতিনিধি। উপাচার্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করলে তাঁরা উপাচার্যকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করেন মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোর কৃতিত্ব বা মন্দের দায় একমাত্র উপাচার্যেরই।উপাচার্য কোনো আলংকরিক পদ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিপুল প্রশাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সক্রিয় নির্বাহী পদ। অন্য কারও ঘাড়ে দায় চাপিয়ে উপাচার্যের দায়মুক্তির কোন সুযোগ নেই।

সর্বোপরি একজন উপাচার্যের মূল্যায়ন শুধুমাত্র সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ করা বা না-করার মতো একটি বিষয় দিয়ে করা যাবে না এবং তা সঙ্গতও হবে না। তাঁর একাডেমিক যোগ্যতা, পরিচিতি এবং নেতৃত্ব, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নে অবদান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে ভূমিকা– এ রকম আরও অনেক কিছু মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ তাঁকে থেকে দেখতে হবে। সে সব ক্ষেত্রে অধ্যাপক আরেফিন একেবারেই নিশ্চেষ্ট অসফল তা বলা যাবে না।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের মান রক্ষার ব্যর্থতা একজন উপাচার্যের জন্য অনেক বড় ব্যর্থতা বলেই মনে করি। কোনো কোনো নিয়োগ উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তে অবৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে এবং এ রকম অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক আরও রয়েছেন। সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদালতে গেলে এই সমস্ত অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ বাতিল হবে বলে বিশ্বাস করি। একক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বাংলাদেশের নব্বই-উত্তর সকল উপাচার্যই ব্যর্থ। কারণ তাঁরা গত ছাব্বিশ বছরে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেননি।

 

জহিরুল হক মজুমদার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply