khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

বঙ্গবন্ধুর পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়েছিলাম: নায়ক ফারুক

0 40

জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই ইট পাথরের ঢাকা শহরে অথচ বাংলার শ্যামল গ্রামের দামাল ছেলের রূপ তার চেয়ে বেশি করে পর্দায় কেউ তুলে ধরতে পারেনি।তিনি চলচ্চিত্র নায়ক ফারুক। একজন মুক্তিযোদ্ধা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর্যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। অনেকটা সময় কাটিয়েছেন তাঁর সঙ্গে। সেই স্মৃতিচারণ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন নায়ক ফারুক।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কীভাবে পরিচয়?

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়ের আগের একটু গল্প বলতে হবে। পোগজ স্কুলে পড়ার সময়ই আমি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই। ছোটবেলা থেকেই আমার বক্তৃতা শোনার একটা আগ্রহ ছিল। বঙ্গবন্ধু আউটার স্টেডিয়ামে বক্তৃতা দিতেন, আমি প্রায়ই গিয়ে সেখানে বক্তৃতা শুনতাম। এখন তো গুলিস্তানে লাখ লাখ মানুষ, তখন এত মানুষ কল্পনাও করা যেত না। বরং প্রায়ই দেখা যেত শেয়াল হাঁটা চলা করছে। গুলিস্তান যে সিনেমা হল, ওইখানে বন্ধুরা দল বেঁধে যেতাম। সেখানে প্রায়ই দেখতাম ভাসানী সাহেব বক্তৃতা দেন। ওনার বক্তৃতা ভীষণ মজা লাগত। একদিন ভাসানী সাহেবের বক্তৃতা শুনতে দাঁড়ালাম, উনি বলছিলেন ‘এই যে দেখেন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নিজে একটা মেশিন বসাইয়া নিয়াছে। নিজে কাগজ কিনিয়া, সেইখান থেইকা নিজের ইচ্ছা মতো খবর ছাপাইয়া পয়সা কামাই করিতেছে। কি লিখিতেছে? রাজনীতিবিদদের গোমর ফাঁস করিয়া দিতেছে। আমার বড় ভয় করিতেছে, কবে না আমার কোমরে হাত দেয়’ এই যে ঢঙ ঢাঙ করে বক্তৃতা দেওয়া, এটা কিন্তু ভাসানী সাহেব ছাড়া অন্য কোনো বক্তার কাছে আমরা আর পাইনি। এই রকম বক্তৃতা হলে প্রায়ই শুনতে দাঁড়িয়ে যেতাম, একদিন শুনি দরাজ কণ্ঠে একজন বক্তৃতা দিচ্ছেন ‘এ দেশের মানুষ ক্ষুধার্ত থাকবে, এটা হতে পারে না।’ গলা শুনেই চমকে গেলাম। মনে হলো আরে ক্ষুধার্ত তো আমিও থাকি, কে রে এটা ভাই? গিয়ে দেখি লম্বা ছিপছিপা, মোচ আছে, চশমা পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম- নাম কী এই ব্যাটার? সে উত্তর দিল- মুজিব ভাই। তখন থেকে এই আস্তে আস্তে যাওয়া শুরু করলাম- মুজিব ভাইয়ের মিটিং হলেই বেশি যেতাম। মাঝে মাঝে স্টেজে উঠেও মাতব্বরী শুরু হলো, চেয়ারটা সরানো, চেয়ার ঠিক ঠাক করা এইগুলা করে মুজিব ভাইয়ের নজরে পড়ার চেষ্টা চালাতাম। বঙ্গবন্ধু সাহসী মানুষ খুব পছন্দ করতেন। কোনো কিছু হলেই আমরা দাঁড়িয়ে যেতাম- বলেন নেতা কী করতে হবে। এভাবেইমুজিব ভাইয়ের চোখেও পড়ে যাই।

বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

বঙ্গবন্ধুর প্রতি মিটিং-এ আমি ১৫-২০ জন ছেলে নিয়ে গিয়ে স্লোগান দেওয়াতাম। দুপুরবেলা ওদের পরোটা-মাংস খাওয়াতাম। ছেলেগুলোকে নিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে টাকা চাইতাম। বলতাম দ্যান। উনি দুই-চার-পাঁচ টাকা সব সময় দিতেন। একবার বঙ্গবন্ধুর পকেট মারতে গিয়ে ধরা খেলাম। বসে আছেন, ওনার পাঞ্জাবির পকেটে দেখি টাকা দেখা যায়। আস্তে করে দুই আঙ্গুল যেই দিলাম উনি খপ করে আমার হাত ধরে ফেললেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘তোরে না দিলাম টাকা?’ আমি বললাম, দিসেন তো, কিন্তু টাকা দেখলে তো আর ভালো লাগে না! এই ঘটনা আমার প্রায়ই মনে পড়ে, সে কারণে একটা ফিল্মে আমি এই ধরনের একটা সিকোয়েন্সও রেখেছিলাম।

ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গেও তো আপনি যুক্ত ছিলেন, মামলার ব্যারিকেডে ভালোই আটকেছিলেন নাকি?

ছয় দফা আন্দোলনের সময় আমি পরিপূর্ণ একজন তরুণ। ফুল প্যান্ট পরা শিখেছি। মিটিং-মিছিলেও উপস্থিতি বেড়ে গেছে। যেহেতু ঘর আমাকে টানত না, তাই নিজেকে পুরোপুরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ফেললাম। ছয় দফা আন্দোলনের সময় আমার নামে ৩৭টা মামলা করা হয়। এই ৩৭টা মামলা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কিছু উল্টা-পাল্টা করেছিলাম ঠিকই কিন্তু সেগুলো এমন কিছু ছিল না যার জন্য এতগুলো মামলার মুখোমুখি হতে হয়। এইগুলো সবই রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলক মামলা।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নাকি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন?

ছয় দফা আন্দোলনের কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু একদিন আমাদের ডেকে বললেন তোদের নামে মানুষ নানা ধরনের বিচার-সালিশ দেয়। গুণ্ডামী করি এটা তো আর বলতেন না, বললেন তোরা যা খুশি তাই করোস। মানুষ এগুলা বললে তো আমার ভালো লাগে না। আমি বললাম, আমরা যা খুশি তা করি মানে নেতা? ছাত্র ইউনিয়নের ওরা এটা ওটা করে আমরা তো কিছুই করি না। উনি তখন আমাদের বললেন, তোরা কোনো মিটিং-এ গেলে আমার কাছে মানুষ নালিশ করে। তোরা ছাত্র না, বহিরাগত। তোদের মধ্যে ৮০ ভাগ কলেজে পড়োস না। উনি আমাদের বললেন- এগুলা হবে না, একটা সার্টিফিকেট হলেও নাও, জগন্নাথে ভর্তি হও। আমি তখন বললাম- আমি তো ক্লাস এইটে পড়ি। যদি পরীক্ষা দেই আমার পাস কেউ আটকাতে পারবে না, কিন্তু তাতে লাভ কী? আমার ভবিষ্যৎকী হবে? বঙ্গবন্ধু কিছু সময় ভেবে বললেন, তা ঠিকই। তিনি তখন বললেন, তোর মতো যারা আছে, তাদের আমি বলবো না কিন্তু বাকিদের বলবো অন্তত একটা হলেও সার্টিফিকেট নাও। তোরা এ দেশের ভবিষ্যৎ, তোরা সবাই মিলে যদি এ সময়টাকে স্যাক্রিফাইস করতে পারিস তাহলে একটা স্বাধীন দেশ হতে পারে। তার এই কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিব। ঠিক মতো অক্ষরও লিখিনি, অথচ ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করেছিলাম। আমার এইগুলা বলতে কখনো খারাপ লাগে না, নির্দ্বিধায় বলি- আমি ভাই গণ্ডমুর্খ।

দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা কেমন ছিল?

৭ মার্চের বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন- ‘আমি সংস্কৃতির মুক্তি চাই।’ এটার মানে কী? হি ইজ অ্যান আর্টিস্ট। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। এফডিসি তিনি তৈরি করে গেছেন। কালচারাল সেক্টরকে উনি রিচ করে গেছেন।

দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অসংখ্য ছবি নির্মিত হয়েছে। এসব ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে কি?

মনে হয় না। কিছু কিছু সাবজেক্ট এসেছে তবে সামগ্রিকভাবে আসেনি। অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিতে গোলাগুলিটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যুদ্ধের মধ্যে গোলাগুলি তো থাকবেই কিন্তু সেগুলোর বাইরেও অনেক মানবিক দিক ছিল সেই স্টোরিগুলো কেউ তেমনভাবে তুলে আনতে পারেনি।অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের উপর ছবি বানিয়েছেন- নারায়ণ দা, আতা ভাই, সুভাষ দা, চাষী ভাই, কুমকুম ভাই। কিন্তু আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের উপর কয়েকশছবি হতে পারে। তবে সেটা খুব পরিকল্পিতভাবে করতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। আতা ভাই শেষ ছবিটা বানিয়েছিলেন- ‘এখনও অনেক রাত’ ছবির নামটার মধ্যে অনেক কিছু আছে। অনেক মিনিংফুল। এর অর্থ এখনো ভোর হয়নি, ভোর হতে অনেক দেরি আছে। কীভাবে ভোর হবে গুলশানের হলি আর্টিসানের মতো ঘটনা কিংবা শোলাকিয়ার মতো ঘটনা ঘটালে? আমরা এখনো অন্ধকারে আছি।

বর্তমান সংস্কৃতিতে বঙ্গবন্ধুর চেতনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?

বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত ধরে কিছুটা হলেও সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ঠ নয়। তিনি বেচে থাকলে হয়তো আজকে আমাদের সংস্কৃতির আরও অনেক উন্নয়ন ঘটতো। তিনি নিজেও একজন সংস্কৃতিমনা লোক ছিলেন। আমরা তো তাঁকে দেখেছি। স্বাধীনতার পর আমি সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন শুনতাম তিনি দেশের সংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য নানা রকম পদক্ষেপ নিচ্ছেন। শুনে ভালো লাগতো।

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply