Share

মুজতবা খন্দকার: এই মুহূর্তে বেশ আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর সুপ্রিম কোর্ট। আরো সংক্ষেপে বললে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। প্রথম জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অন্যভাবে বললে বিশ্ববিদ্যালয়টির অভিভাবক আর দ্বিতীয়জন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের অভিভাবক। দু’জনই দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি। কিন্তু প্রথমজন নানা কারণে নিন্দিত। আর দ্বিতীয়জন জাতিকে নাড়া দেয়া একটি রায় দিয়ে নন্দিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার, স্বাধীনতা, সবশেষ স্বৈরাচারী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। অথচ সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ পঙ্কিলতায় ডুবতে বসেছে। অনেকটা নিরবে। সবার অলক্ষ্যে। দলীয় স্বার্থ, দলবাজির কারণে জাতির মেধা, মনন আর আস্থার সবচেয়ে বড় জায়গাটি, সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়টি আজ ক্যান্সারে আক্রান্ত। সবশেষ এই প্রতিষ্ঠানের সিনেট অধিবেশন নিয়ে যে নাটক মঞ্চস্থ করা হলো তাকে দলীয় রাজনীতি, ব্যক্তি স্বার্থ আর স্বৈরাচারী মনমানসিকতার চমৎকার মঞ্চায়ন বললে ভুল হবে না। অর্ধেক সদস্য দিয়ে যে সিনেট অধিবেশন হলো। তাতে বিনা নির্বাচনে ফের ভিসি প্যানেল মনোনয়ন দেয়া হলো বর্তমান ভিসি আরেফিন সিদ্দিকসহ তিনজনকে।

যে পদ্ধতিতে ভিসি প্যানেল মনোনয়ন দেয়া হলো তার সাথে গণতন্ত্রের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনভাবেই যায় না। এই অধিবেশন চলাকালীন ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষকদের নেতৃত্বে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে হামলা চালানো হলো তাতো আরো ন্যাক্কারজনক। এর নিন্দা করার কোন ভাষা কারো কাছে কি আছে। আর এসবই হচ্ছে, হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খোদ ভিসির ব্যক্তিস্বার্থের কারণে। শুধু কি তাই তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সময়ে প্রায় নয়শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্লাস ঠিকঠাক মত হচ্ছে হয়েছে। এটা প্রায় বলতে শোনা যায়। কোন গোলমাল, ফ্যাসাদ হয়নি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলো কি তাদের স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারছে?

হলগুলোতে কি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন গুলোর নেতাকর্মীর সহাবস্থান আছে? নাই বলতে বাধ্য হতে হয়, তার এই নয় বছরে দেশের অন্যতম প্রধান ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ক্যাম্পাসের বাইরে। সংগঠনটির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের বাইরে হল থেকে বিতাড়িত। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে তিনি তাদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার কোন উদ্যোগ গত নয় বছরে নেননি। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোন সংকটে পরিবেশ পরিষদের সভা ডাকতেন ভিসি।

গত নয় বছরে এমন কোন সভার কথা আমরা শুনিনি। তিনি শিক্ষার্থীদের ভিসি নয় তাকে যদি শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের অভিভাবক বলাটাই বোধ করি যুৎসই হবে। কারণ তিনি অন্যকোন ছাত্র সংগঠন নয় এমনকি ছাত্র নয় তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরকেই নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছেন, প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন।বিশ্ববিদ্যালয় কাজের টেন্ডারবাজি করতে টেন্ডার পাইয়ে দিতে রেখেছেন ভূমিকা। এসব প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আলোচনা সমালোচনা হতেই পারে। এ নিয়ে বলার কিছু নেই। (প্রথম আলো ৫ আগষ্ট)। অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তিনি মেনে নিলেন কত সহজে। যেন এসব বড় কোন অভিযোগ নেই। রাষ্ট্রে যখন অনিয়ম নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রভাব পড়বে সেটাই তো স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়তো আর বিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপ নয়।

ভিসি তখন ভিসি এখন

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের একটি অধিবেশনে তিনি তখন জেনেভায়। সেখানে একটি পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন। সিদ্ধান্ত নেন পদত্যাগ করার। এরপর ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, ‘আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।

১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমল। মোহাম্মদ শামসুল হক তখন উপাচার্য। এক ছাত্র বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনজনকে বহিস্কার করতে হুকুম জারি করেন স্বৈরাচার এরশাদ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার কাছে উপাচার্য পদ নগণ্য। বহিস্কার নয়, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। সরকারের অন্যায় আদেশ না মেনে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। প্রথমে সরকার পদত্যাগপত্র নিতে চায়নি। নানা লোভ দেখায়…কিন্তু অনড় ছিলো শামসুল হক। ব্যক্তিত্বের কাছে ক্ষমতা পরাজিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন অধ্যাপক মাহমুদ হুসেইন। তিনি ভারতের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি জাকির হোসাইনের ভাই। ১৯৬২ সালে প্রাদেশিক গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান ঢাকা কলেজে ছাত্রবিক্ষোভের মুখে পড়েন। এরপর মোনায়েম খান ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপাচার্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।কিন্তু উপাচার্য মাহমুদ হুসাইন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ঘটেনি, তাই বিষয়টি তাঁর এখতিয়ারবহির্ভূত। আমি অন্যায়ভাবে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যাবস্থা নিতে পারব না। এতে অসন্তুষ্ট হন মোনায়েম খান। বহিস্কারের জন্য নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। এরপরেও ব্যাবস্থা না নিয়ে পদত্যাগ করেন মাহমুদ হুসেইন।

আর এখন কি এরকম মেরুদণ্ড সম্পন্ন কোন ভিসিকে আমরা খুঁজে পাবো। যিনি সবার আগে দেখবেন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ? উপরন্তু এখন আমরা পাই ঠিক তার বিপরীত দৃশ্য।২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে একটি স্থায়ী সহকারী অধ্যাপক এবং একটি স্থায়ী প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে একজন বিভাগের ১৯তম স্থান অধিকারী হয়েও শিক্ষক হন। তাঁর যোগ্যতা ছিল, তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। ওই নিয়োগে বাদ পড়েছিলেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এক প্রার্থী।এর আগে ফার্মাসিউটিক্যাল, কেমিস্ট্রি বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া একাধিক প্রার্থীকে বাদ দিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে যথাক্রমে দশম ও দ্বাদশতম স্থান অধিকারীকে নেওয়া হয়। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের এক ছাত্রী অভিযোগ করেছিলেন, বিবিএ ও এমবিএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও দু’বার সাক্ষাৎকার দিয়েও শিক্ষক হতে পারেননি। তাঁর জায়গায় ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থান অধিকারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই হচ্ছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের একটি ছোট্ট খতিয়ান। এ থেকেই সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় কেমন চলছে তার একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি ভিসি, যিনি রেকর্ড করছেন এই পদে থাকার। সেই আরেফিন সিদ্দিক তার ক্ষমতায়ন, তার ভিসির শাসন প্রলম্বিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যত অনিয়ম করা যায় তার সব করেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির শাস্তি চাই। চাই দুদক তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের প্রত্যেকটির তদন্ত করুক। একটি বিশ্ববিদ্যালয় এরকম স্বেচ্ছাচারীভাবে চলতে পারে না। ৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ কাউকে স্বৈরাচারী হবার লাইসেন্স দেয়নি। তিনি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। জাতির মেধামননকে ধ্বংসের দিকে নিচ্ছেন।উনি নিজ স্বার্থের কাছে, ক্ষমতার লোভে বিবেকের কাছে পরাভূত হয়েছেন। অপেক্ষাকৃত শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষক হিসেবে তার একটা খ্যাতি আছে। তার মানবিক গুণাবলিগুলো প্রশংসনীয়। তিনি ব্যক্তি জীবনে সৎ। সবই ঠিক আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, কেউ যদি তার চারপাশের অন্যায়গুলো মেনে নেন। নিজের স্বার্থে যাবে বলে অন্যায়, অন্যায্যতা দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন, তবে তার ব্যক্তিগত আর্থিক সততার কি আবেদন থাকলো?

খবর বেরিয়েছে, তিনি তার আমলে নয়শোর উপরে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। পঁচিশ হাজারের বেশী শিক্ষার্থী অধ্যুষিত একটি শিক্ষালয়ে সেটা তিনি দিতেই পারেন, সেটা সবার জন্য সুসংবাদও হতে পারতো, যদি সেটা যোগ্যতা কিংবা মেধার ভিত্তিতে হতো! কিন্তু যেভাবে পাইকারি হারে নিয়োগ দিয়েছেন, যোগ্যতা শিথিল করে কেবলমাত্র তার অনুগত বলে, তুলনামূলক মেধাবীদের বাদ দিয়েছেন। এসব যদি সত্যিই হয়, তবে তা বেদনার কারণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় কি!

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু লাগে না! দেশের আগামী দিনের চালকদের বেশীরভাগ আসেন, এই শিক্ষাঙ্গন থেকে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে আমাদের কত গর্ব, কত আশা, কত ভরসা! অথচ এরকম অযোগ্য, নিম্ন মেধাবীদের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে, জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর পেছনে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রধান অভিভাবক নেপথ্যে ভূমিকা রেখে চলছেন, এটা কল্পনা করাও তো পাপ!
অথচ নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, সেটাই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সত্যি হতে চলেছে। ভিসির আরো অনেক অনিয়ম ক্রুটি এখানে ধর্তব্যের মধ্যে না নিয়ে বলা যায়, শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ড সচেতনভাবে ধ্বংস করার জন্য ঢাবির ভিসি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ।

কারণ দেশের সাথে যে প্রতারণা করে তাকে কোনোভাবেই মার্জনা করা যায় না। সরি! স্যার! মার্জনা আমাকেই করবেন! সবাই নিশ্চই মুখ বুঁজে থাকবে না। আপনাকে স্তুতি করে অনেকেই লিখছেন, তাদের অনেকেই আপনার সুবিধাভোগী। তারা কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ হয়ে আপনাকে মিথ বানানোর নিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা সত্যটা বলছে না!আপনি মিথ হতে চাননি, কখনো। আপনি ক্ষমতাকে ভালবেসেছেন! সেই ক্ষমতার জন্য আপনি দেশ, দশের কথা চিন্তা না করে যেসব কাজ করেছেন, করছেন সেটাই আপনার এতদিনের গড়া ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, আপনি টের পাচ্ছেন না। ক্ষমতার বলয়ে থাকলে অনেক কিছু টের পাওয়া যায় না!

সরি স্যার আপনার জন্য করুণা হয়। কারণ, আপনি হতে চেয়েছিলেন রাম। কিন্তু দিনশেষে রাবণের পরিচয়ই আপনার বিধিলিপি হলো! এর চেয়ে দুঃখের কি কোন কিছু হতে পারে!

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

Print Friendly, PDF & Email
Share
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

Leave a Comment

 




 

*

 
 
39Total Views
Share
Share

Hit Counter provided by shuttle service from lax