khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

এর নাম শিক্ষা-শিক্ষক রাজনীতি!

0 12

গোলাম মোর্তোজা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতির ভয়ঙ্কর-কুৎসিত রূপের কিছুটা দেখার সুযোগ হয়েছিল, ড. রিয়াজুল হকের বিরুদ্ধে শতভাগ অসত্য ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের অভিযোগ এনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সময়ে। নেপথ্যে ছিল কিছু শিক্ষকের প্রশাসনিক অনিয়ম ও বিভাগের আর্থিক দুর্নীতি আড়াল করা। সেসব অভিযোগ প্রকাশ হয়েছে, আদালতের রায়ে ড. রিয়াজুল আবারও শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগকারীদের অন্যায়- দুর্নীতির অভিযোগের কোনও তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাসন। নেবে কিভাবে, প্রশাসন নিজেই সক্রিয়ভাবে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। প্রোভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান প্রকাশ্যে বলেছিলেন,‘ড. রিয়াজ শ্রেণিকক্ষে যে অশ্লীল চিত্র প্রদর্শন করেছেন, তা পর্নোগ্রাফির পর্যায়ে পড়ে।’

তদন্তে যার সামান্যতম কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ বিভাগ থেকে তো অসত্য অভিযোগ আনা হয়েছিলই, আর প্রোভিসি নিজে তার চেয়ে বড় অসত্য প্রচারণা চালিয়েছিলেন। সেই সময় ন্যায্যতার পক্ষে যে অল্প কয়েকজন শিক্ষক দাঁড়িয়েছিলেন, অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক তাদের অন্যতম একজন। এই সুযোগে আরেকজনকে ধন্যবাদ না জানালে অন্যায় হবে, তিনি অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

ফিরে আসি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে। শিক্ষকদের ক্লোজ গ্রুপে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক। তার মন্তব্যে অসম্মানিতবোধ করেছেন অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমদ। দু’জনেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকদের ভেতরে বিশেষ করে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভেতরে নীতি-অবস্থান নিয়ে তর্ক – বিতর্ক হবে, এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। তাই বলে এক শিক্ষক আরেক শিক্ষকের নামে মামলা করবেন? তাও আবার ৫৭ ধারায়?

আইসিটি আইনের এই ধারা একটি কালো আইন হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই আইনের সমালোচনা করছেন। সাংবাদিকতা বিভাগের যেসব শিক্ষক টকশোতে আসেন, তাদের কেউ সরাসরি কেউ একটু ঘুরিয়ে ৫৭ ধারার সমালোচনা করেন, বাতিলের দাবি জানান।কট্টর সরকার সমর্থক শিক্ষকরাও ৫৭ ধারার পক্ষে কথা বলেন না। মিনমিন করে হলেও ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি তারাও জানান। সাংবাদিকতা বিভাগও কয়েকদিন আগে ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছে।

সেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমদ ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক মনসুরের সঙ্গে টকশোতে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। সরকারের মতামত বা অবস্থানই তার মতামত বা অবস্থান। তার নিজস্ব কোনও অবস্থান বা বিশ্লেষণ আছে বলে মনে হয়নি। আমি ঠিক নিশ্চিত হতে পারছি না, যতদূর মনে পড়ছে তাতে মনে হয় টকশোতে তিনিও ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অর্থাৎ ৫৭ ধারা এমনই কালো আইন, যার পক্ষে কথা বলার প্রায় কোনও সুযোগ নেই।

সেই কালো আইনের আশ্রয় নিয়ে অধ্যাপক মনসুর মামলা করে নিজের পরিচিতিটা পরিষ্কার করলেন যে,তিনি একজন সরকার সমর্থক শিক্ষক। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অধঃপতনের পেছনে অনেক কারণ আছে। যা অধ্যাপক মনসুরদের চোখে পড়ে না। প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যে দলীয় রাজনীতির কাছে তারা বিবেক বন্ধক রেখে আত্মসমর্পণ করেন।

অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক লেখক মানুষ। দাসত্ব ব্যাপারটা তার মধ্যে নেই। মুক্তভাবে চিন্তা করার নীতিতে বিশ্বাস করেন। সেভাবে নিজে চিন্তা করেন, অন্যদের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাচার- অনিয়ম, অধঃপতন তাকে উদ্বিগ্ন করে। তাকে ব্যথিত করে শিক্ষকদের কলুষিত রাজনীতি। নিজের স্বার্থে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অপকর্মে উৎসাহিত করেন, দেখেন চোখের সামনে। পাঠদানে আগ্রহ থাকে না, গবেষণা তো করেনই না, শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতি করেন। অন্যায়ের পক্ষে শিক্ষকদের অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা তাকে বিচলিত করে। তিনি তা জেনে- বুঝে চুপ করে থাকেন না। বলেন, লেখেন। তার এই বলা- লেখা- চিন্তা দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকরা পছন্দ করেন না। এই শিক্ষকরা পছন্দ করেন না দুই কারণে।

ক. শ্রেণি কক্ষে পাঠদান এবং চিন্তা- লেখার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক ফাহমিদুল হকদের পছন্দ করেন। শিক্ষাঙ্গণের বাইরেও তাদের একটা ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়।শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক ফাহমিদুল হকরা শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে থাকেন, অধ্যাপক মনসুর আহমদদের তুলনায়, যা সরকার সমর্থক শিক্ষকদের মর্মপীড়ার কারণ হয়।

খ. সরকার সমর্থক শিক্ষকরা মনে করেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করি। ক্ষমতা আমাদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বা সরকারের সমালোচনা কেন ফাহমিদুল হকরা করবেন? কেন তারা জনপ্রিয় হবেন, কেন শিক্ষার্থীরা তাদের আলাদা একটা শ্রদ্ধার চোখে দেখবে? ফলে তারা ক্ষমতার ব্যবহার করেন। অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হকদের কারও নামে ৫৭ ধারায় মামলা করেন, কারও নামে অসত্য অভিযোগ এনে চরিত্রহনন করার উদ্যোগ নেন। ক্ষমতার দাপটে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যোগ্যতায় না পেরে গায়ের জোর দেখানোর একটা প্রবণতা আমাদের সমাজে বহু আগে থেকেই আছে। তা এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাও ধারণ করছেন। ড. রিয়াজ থেকে ড. ফাহমিদুল হক, মাঝে রুশাদ ফরিদী সব ক্ষেত্রেই সেই চিত্র দৃশ্যমান।

২.

পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে রুশাদ ফরিদীর ঘটনা সম্পর্কে একটু বলা দরকার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। কয়েকদিন আগে ‘প্রথম আলো’তে একটা লেখা লিখেছেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: উল্টো পথে কি শুধুই বাস’ শিরোনামে। যেন নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছেন। অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সরকার সমর্থক শিক্ষকরা কিছুদিন ধরে তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। বিভাগের নানা অনাচার-অনিয়ম নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন। লিখিতভাবে একাধিক চিঠি দিয়ে চেয়ারম্যানকে তা জানিয়েছেন। পাঠদান, একাডেমিক কার্যক্রম কোন শিক্ষক কিভাবে কারা ব্যাহত করছেন, সুনির্দিষ্ট করে তা চিঠিতে লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। চেয়ারম্যান নিরব থেকেছেন।

‘উল্টো পথে কি শুধুই বাস’ শিরোনামের লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম- অনৈতিকতার বিষয়গুলো সহজ- সরল-বোধগম্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা বিষয়ে সচেতন মানুষের কাছ থেকে রুশাদ ফরিদী বাহবা – শ্রদ্ধা পেয়েছেন, প্রশংসিত হয়েছেন। এটাই হয়েছে তার বিপদের কারণ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষিপ্ততা বেড়ে গেল বহুগুণ। শ্রদ্ধা- জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষকরা একদিনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে কাগজপত্র প্রস্তুত করে একটা একাডেমিক মিটিংয়ে শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। সেদিনই সিন্ডিকেট মিটিংয়ে তা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। জানা গেল, অর্থনীতি বিভাগের ৩১ জন শিক্ষক জানিয়েছেন, তারা রুশাদ ফরিদীর সঙ্গে কাজ করবেন না। ফলে সিন্ডিকেট শিক্ষক রুশাদ ফরিদীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে। মুক্ত বা ভিন্ন বা শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা, দলীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি না করা শিক্ষকদের দমন করার এমন নীতির বেশ ভালো মতোই প্রয়োগ হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

৩.

অর্থনীতি বিভাগের ৩১ জন শিক্ষক কী অভিযোগে রুশাদ ফরিদীর সঙ্গে কাজ করবেন না, তা রুশাদ ফরিদী জানেন না। অথচ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তাকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেই চিঠিতে কোনও কারণ লেখা হয়নি।

সরকার সমর্থক শিক্ষক নেতা ফরিদ উদ্দীন আহমেদ একটি পত্রিকাকে বলেছেন, ৩১ জন শিক্ষকের অভিযোগের বিষয়টি। পত্রিকা থেকে জেনেছেন রুশাদ ফরিদী। যেভাবে পত্রিকা থেকে ‘অশ্লীল চিত্র’ প্রদর্শনের কথা জেনেছিলেন ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হক। এই ঘটনার নেপথ্যে থেকে বিভাগের জামায়াতি শিক্ষকদের শক্তি যুগিয়েছিলেন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। রুশাদ ফরিদীর ঘটনায়ও সামনে এসেছেন ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। জনতা ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে নিজের নাম সম্পৃক্ত করে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ। নিজেকে শেখ কামালের বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করেন।

দেশের প্রধানতম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠান, দেশ-জাতির প্রয়োজনে অন্যায়- অনৈতিকতার বিরুদ্ধের প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠান, ক্রমশ অনৈতিকতার ধারক- বাহক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে। যোগ্য- মেধাবী শিক্ষকদের বিতাড়িত এবং যোগ্যতাহীনদের পৃষ্টপোষকতা, অযোগ্যদের দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব ঘটছে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যখন উপাচার্য। উপাচার্য হওয়ার আগের আরেফিন সিদ্দিক, আর উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিকের কি যোজন যোজন পার্থক্য!

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

Print Friendly, PDF & Email

Leave A Reply


Hit Counter provided by shuttle service from lax