khabor.com, KHABOR.COM, khabor, news, bangladesh, shongbad, খবর, সংবাদ, বাংলাদেশ, বার্তা, বাংলা

টিউলিপের জয়লাভের সম্ভাবনা কতটুকু?

39

তানভীর আহমেদ : নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কনজারভেটিভ পার্টিকে বর্তমান আসনগুলোতে জয়লাভ করতে হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে যদি আরো অধিক শক্তিশালী কনজারভেটিভ সরকার পেতে চান তাহলে তাকে লেবার পার্টির আসনেও হানা দিতে হবে। লন্ডনের ৮টি স্পর্শকাতর আসনকে টার্গেট করেছে ক্ষমতাসীন টোরি। এই আসনগুলো লেবার পার্টির দখলে। বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকের হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসনটি সেই মার্জিনাল সিটের একটি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে টিউলিপ সিদ্দিক কনজারভেটিভ দলের প্রার্থীর চেয়ে ১১শ’ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। তাই সাধারণের মনে প্রশ্ন উঠেছে যেহেতু লেবার পার্টির জাতীয়ভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়নি তাই এই আসনটিতে বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকের জয়লাভের সম্ভাবনা কতটুকু?

টিউলিপের আসনে নির্বাচনে জয় পরাজয়ের ফ্যাক্টর বিবেচনা করার আগে এই অঞ্চলের ডেমোগ্রাফির একটা বিশ্লেষণ করা জরুরি। টিউলিপ সিদ্দিকের নির্বাচনী আসনে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮১ হাজারের মতো। ২০১০ সালে বাউন্ডারি কমিশনের সীমানা নির্ধারণের পর এই আসনের নতুন নামকরণ হয় হ্যাম্পসডেট অ্যান্ড কিলবার্ন। ইতিপূর্বে এই আসনটির নাম ছিল হ্যাম্পসেড অ্যান্ড হাই গেইট। ঐতিহ্যগতভাবে গত বিশ বছর ধরেই এই আসনটি লেবার পার্টির দখলে হলেও কনজারভেটিভ দলের প্রার্থীদের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। টিউলিপের উত্তরসূরি গ্লেন্ডা জ্যাকসন ২০১০ সালে মাত্র ৪৪ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। ২০১৫ সালে টিউলিপ জিতেছিলেন ১১শ’ ভোটের ব্যবধানে। তাই লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হলেও এবার টিউলিপের জয়ের ব্যবধান বাড়বে।

গত সপ্তাহে হ্যাম্পসডেট ও কিলবার্নে টিউলিপের নির্বাচনী প্রচারে দীর্ঘক্ষণ কথা হলো টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে। টিউলিপের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, জয়ের ব্যাপারে তিনি কতটা আশাবাদী? টিউলিপ বললেন, ‘দেখুন, ব্রেক্সিট ইস্যুতে আমার নির্বাচনী এলাকার ৭৫ শতাংশ ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ১৭ হাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ভোটার থাকেন এই নির্বাচনী এলাকায়। তারা প্রচণ্ড অনিশ্চয়তায় রয়েছেন, তারা জানেন না কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় আসলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? তারা কি এ দেশে থাকতে পারবে নাকি চলে যেতে হবে? এ ব্যাপারে টোরি কোনো পরিষ্কার ধারণা দিতে পারছে না। তাছাড়া আমি ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্ট থেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে পার্লামেন্টের শ্যাডো ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। ওয়েস্টমিনস্টারে গিয়ে আমি আমার এলাকার মানুষকে ভুলে যাইনি।’

টিউলিপ আরেকটি তথ্য দিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ব্যাক বেঞ্চার (নবীন এমপি যারা সাধারণত পেছনের আসনে বসেন) এমপিদের মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিকই প্রধানমন্ত্রীকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করেছেন। এটি খোদ হাউজ অব কমন্সের স্পিকারের দফতর থেকে পাওয়া তথ্য। এই তথ্য থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, ওয়েস্টমিনস্টারে টিউলিপ কতটা সক্রিয় ছিলেন। যারা ব্রিটেনের রাজনীতি খেয়াল করেন তাদের মনে আছে যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে টিউলিপের দেয়া উদ্বোধনী বক্তৃতাটি (ওয়েস্টমিনস্টার পার্লামেন্টের ভাষায় মেইডেন স্পিচ বলা হয়ে থাকে) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তালিকায় সপ্তম স্থানে উঠে এসেছিল।
টিউলিপের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আপনার দলের লিডার জেরিমি করবিন এখনো জনমত জরিপে থেরেসা মে’র থেকে প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছেন। সেই হিসাব এই আসনে লেবার পার্টির ভোটে প্রভাব ফেলবে কিনা? টিউলিপ বললেন, ‘আপনি নির্বাচনী বিতর্কে দেখেন টেলিভিশনে থেরেসা মে কেমন নাস্তানাবুদ হয়েছেন।’

টিউলিপ বললেন, ‘থেরেসা মে একজন মিথ্যাবাদী। কতবার তিনি বললেন, ২০২০ সালের আগে নির্বাচন দেবেন না, তিনি এখন নির্বাচন দিলেন। শিশু শরণার্থীদের ব্যাপারে থেরেসা মে ব্রিটেনের দরজা খোলা রাখবেন বলে বলেছিলেন, এখন দেখেন কেমন করে এই শিশু শরণার্থীদের দরজাটা তিনি বন্ধ করে দিলেন।’

টিউলিপ সিদ্দিক জানতে চাইলেন, ‘আমাদের রাস্তায় সেনাবাহিনী কেন বলতে পারেন? ম্যানচেস্টারে এত বড় একটা হামলা হলো আর প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় সেনাবাহিনী নামিয়ে দিলেন। আমরা (লেবার পার্টি) সব সময় বলে আসছি পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে, টোরি সরকার এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়নি। আমাদের ইন্টেলিজেন্স কেন ব্যর্থ হলো বলতে পারেন? সবকিছুতে বাজেট কর্তন করে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে কনজারভেটিভ সরকার। থেরেসা মের পেনশন পলিসি দেখেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের ভাতার ওপর তিনি ক্যাপ আরোপ করবেন বলে বলেছেন, পেনশনাররা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, কনজারভেটিভ আসলে তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে তারা জানেন না।’ টিউলিপ যোগ করলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ফ্রি করে দেবে আমাদের সরকার (লেবার পার্টি)। এই ইস্যুতে তরুণ ভোটাররা লেবার পার্টির দিকেই ঝুঁকছে। এই সরকার আমার নির্বাচনী এলাকায় ন্যাশনাল বাজেটের অংশ থেকে কর্তন করতে করতে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে এই আসনে শর্টফল এখন ১৮ মিলিয়ন পাউন্ডে গিয়ে ঠেকেছে।’

টিউলিপের আসনে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভোটারদের সংখ্যা ১১শ’র কিছু বেশি। টিউলিপ নির্বাচিত হওয়ার পর এই এলাকা বিশেষ করে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির তরফ থেকে দাবি উঠেছিল, ব্রিটিশ ভিসা অফিস দিল্লি থেকে পুনরায় ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি যেন কার্যকরী উদ্যোগ নেন। জানতে চাওয়া হয়, এই ইস্যুতে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন? টিউলিপ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিলেন, তিনি ভিসা অফিস ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে পার্লামেন্টের একাধিক এমপিকে নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার কনজারভেটিভ সরকারের তাই ভিসা অফিস ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এখনো অপরিবর্তিত।

সবশেষে ভোটার তালিকার ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণও নির্বাচনে টিউলিপের জয়ের পাল্লা ভারি করে দেয়। মোট ভোটারের ১০.৭ শতাংশ মুসলিম তাই মুসলিম ভোটারদের ভোট টিউলিপের বাক্সে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ৬.৫ শতাংশ জিউইস ভোটও টিউলিপ পাবেন কেননা এই কমিউনিটিত টিউলিপের রয়েছে শক্ত অবস্থান। মোট ভোটারের ১৩ শতাংশ এশিয়ান ও ১০ শতাংশ আফ্রিকান এবং ৬ শতাংশ মিশ্র কমিউনিটি। লেবার পার্টি বরাবরই এশিয়ান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১১ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ ভোটারদের কাছে লেবার পার্টির টিউশন ফি মওকুফের ইশতিহার বেশ সাড়া ফেলেছে। ৭ শতাংশ পেনশনার যারা কনজারভেটিভ পার্টির ইশতিহারে তাদের ওপর ক্যাপ বসানোর কারণে ইতিমধ্যে লেবারের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন তাদের ভোটও নির্বাচনে ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে। বাকি ৪০ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ভোটারের মধ্যে লেইবার ও কনজারভেটিভের প্রায় সমান জনপ্রিয়তা। তাই ফলাফল বদলে দেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি ও ১৭ হাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক। তবে জনমত জরিপ আর সব বিশ্লেষণকে বিশ্বের সমসাময়িক নির্বাচনগুলো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিপরীত ফলাফল উপহার দেয়ার নজিরও রয়েছে। টিউলিপের আসনে এমন কিছু না হলে টিউলিপ সিদ্দীকের নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ের সম্ভাবনা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক: একাত্তর টেলিভিশনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি।

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed.