Share

ঢাকা: বড় বাপের পোলায় খায়/ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়/ধনী-গরিব সবাই খায়/মজা পাইয়া লইয়া যায় – পুরান ঢাকার চকবাজারে ঢুকলেই শোনা যায় এমন ছন্দময় হাঁকডাক। এ অঞ্চলের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘বড় বাপের পোলায় খায়’, যার নাম এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। রাজধানীর ইফতারির বাজারের প্রসঙ্গ এলে সর্বপ্রথম চলে আসে চকবাজারের নাম। মূলত ঐতিহ্য, স্বাদ ও বৈচিত্র্যময় ইফতারি পাওয়া যায় এখানে। তাই শুধু স্থানীয়রাই নন, দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে এখানে আসেন ভিন্ন রুচি ও স্বাদের বাহারি ইফতারি কিনতে। পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ নির্মাণ করেন শাহী মসজিদ। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে এ স্থাপনার আসল রূপ। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবার রমজানেও এ মসজিদের সামনের সড়ক তথা চকবাজারে যে রকমারি মুখরোচক ইফতারির পসরা বসেছে, তার স্বাদ ও গন্ধ মোগল আমলের সেই রসনাবিলাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে মনে পড়ে যায় পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের কথা। স্থানীয়রা একে বলেন ইফতারির শাহী বাজার। শাহ বা রাজাদের ঐতিহ্যম-িত বলেই এমন নামকরণ।

প্রতিবারের মতো এবারও চকবাজারের ইফতারির বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক ইফতারসামগ্রীও। তবে দাম গতবারের চেয়ে বেশি। বিক্রেতারা জানান, উপকরণের দাম বাড়ায় ইফতারির দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাংস দিয়ে তৈরি ও মিষ্টিজাতীয় ইফতারসামগ্রীর দাম।

রমজান শুরুর আগের দিন অর্থাৎ গত শনিবার থেকেই চকবাজার শাহী মসজিদের সামনের রাস্তাসহ আশপাশের সব রাস্তায় শামিয়ানা টানিয়ে ইফতারসামগ্রী বিক্রির প্রস্তুতি নেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল দুপুর ১২টার পর থেকেই হরেক পদের বাহারি খাবারে পূর্ণ হয়ে যায় এ ইফতারির বাজার। অনেককে দোকানের পাশেই চুলা বসিয়ে গরম গরম বিভিন্ন ইফতারসামগ্রী তৈরি করতে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে জিলাপি, পেঁয়াজু, ডিমচপ, আলুচপ, টক দইয়ের চপ ইত্যাদি। প্রতিবারের মতো এবারও এ ইফতারি বাজারের প্রধান আকর্ষণ বড় বাপের পোলায় খায়। সঙ্গে আছে আস্ত খাসির রোস্ট, টক দইয়ের চপ, মাংস ও দই-পরোটা।

মাঝারি আকারের একটি খাসিকে আস্ত কাবাব বানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে আস্ত খাসি। পাশাপাশি বড় খাসির রেজালাও বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর দাম রাখা হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। বড় বড় পরিবার বা পার্টিতে এগুলোর কদর বেশি। অনেকে অর্ডারও দিয়ে যান। বিভিন্ন মাংস দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ এক ধরনের পরোটা, যা পরিচিত মাংস-পরোটা নামে। মাংসের পরিমাণভেদে প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ১৫০-২৫০ টাকায়। পরোটার মধ্যে টক দইয়ের গাঢ় অংশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দই-পরোটা। প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৭০-১০০ টাকায়।

চকবাজারের ইফতার বিক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই মৌসুমী ব্যবসায়ী। তারা বাসাবাড়ি থেকে এগুলো তৈরি করে আনেন। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে আলাউদ্দিন সুইটমিট, আনন্দ বেকারি, মুসলিম বিরিয়ানিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও ইফতারি বিক্রি করে।

ঢাকার ইতিহাস ৪০০ বছরেরও বেশি সময়ের। চকবাজারের ইফতারির ইতিহাসও পেরিয়ে এসেছে প্রায় ৩০০ বছর। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকার ৪০০ বছর’ শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছেÑ ঢাকার তৎকালীন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ১৭০২ সালে চকবাজারকে একটি আধুনিক বাজারে রূপ দেন। তখন থেকেই প্রতি রমজানে এখানে বসে মুখরোচক ইফতারির ভাসমান বাজার। সেই ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে এ বাজার বিকশিত হয়েছে। মূলত চকবাজার শাহী জামে মসজিদসংলগ্ন গলিতে বংশপরম্পরায় ইফতারসামগ্রী বিক্রি করে আসছেন স্থানীয়রা।

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, দুপুর ১২টা থেকেই শাহী মসজিদের সামনের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাস্তার মাঝখানেই সারি সারি দোকান, উপরে শামিয়ানা। স্থানীয়রা জানান, চকবাজারের চারদিকে পাঁচ শতাধিক ইফতারির দোকান বসে।

দেখা গেল, বিশাল শিকের সঙ্গে জড়ানো সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শাকপুলি, টিকা কাবাব, ডিমচপ, কাচ্চি, তেহারি, মোরগ পোলাও, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, মোল্লার হালিম, নূরানি লাস্যি, পনির, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, পেস্তা বাদামের শরবত, লাবাং, ছানামাঠা, কিমা-পরোটা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, বেগুনি, আলুচপ, পেঁয়াজু, আধা কেজি থেকে শুরু করে পাঁচ কেজি পর্যন্ত ওজনের জাম্বো সাইজ শাহী জিলাপিসহ নানা পদের খাবার নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। এ ছাড়া আতা-আনারস-বিলাতি গাব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফল, পিঠা-পায়েস, মিষ্টিসহ ইফতারের নানা সামগ্রীও বিক্রি হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email
Share
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

Leave a Comment

 




 

*

 
 
179Total Views
Share
Share

Hit Counter provided by shuttle service from lax